নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে সেবা গ্রহনেও লাগবে রিটার্ণ জমার সনদ যা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র সহ অন্যান্য বিভিন্ন কাজে শুধু টিআইএন জমা দিলেই হতো কিন্তু এখন রিটার্ণ জমা দেওয়ার রশিদ বা সনদ জমা দিতে হবে। মূলত টিন ধারীদের রিটার্ণ জমা দিতে বাধ্যতার মধ্যে আনতেই সরকারি এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে এমন ৩৮ ধরনের সেবা নিতে হলে রিটার্ন জমা দেয়ার প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে দেয়া বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, করদাতার সংখ্যা এবং করের পরিমাণ বাড়াতে কিছু সেবা পাওয়ার জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেয়া হবে, সেখানেই এসব প্রমাণ দেখাতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে এসব প্রমাণ সংগ্রহ করে না রাখে, তাহলে সেসব প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র অথবা করদাতার নাম, টিআইএন ও কর বছর উল্লেখ করে অনলাইনের এনবিআরের সনদ অথবা উপ-কর কমিশনারের সনদ গ্রহণযোগ্য হবে। জরিমানা ছাড়াই পুরনো অর্থবছরের রিটার্ন জমার সুযোগ রাখা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবে।

যে সব সেবা পেতে আয়কর রিটার্ন জমার রশিদ বা প্রমাণক দেখাতে হবে

  1. পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা পোস্টাল সেভিংস কিনতে হলে আয়কর জমার প্রমাণ দেখাতে হবে। যেখানে তিনি সঞ্চয়পত্র কেনার আবেদন করবেন, সেখানেই প্রমাণ জমা দিতে হবে।
  2. পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ নেয়ার আবেদন করলে;
  3. ব্যাংক জমার সুদ আয় থেকে উৎস কর কর্তনে রিটার্ণ সনদ থাকলে ১০ শতাংশ কাটা হবে অন্যথায় ১৫%;
  4. ১০ লাখ টাকা বেশি মূল্যের জমি বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি, বিক্রি, দলিল হস্তান্তর, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে হলে ক্রেতাকে রেজিস্ট্রি অফিসে রিটার্ন জমার স্লিপ জমা দিতে হবে।
  5. যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেডিট কার্ড নিতে হলে;
  6. দুই বা তিন চাকা ছাড়া যেকোনো মোটরগাড়ি নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়ন করতে;
  7. সিটি করপোরেশন বা জেলা সদর, পৌরসভায় সন্তান বা পোষ্যদের আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমের আওতায় ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল বা জাতীয় পাঠ্যক্রমের আওতায় ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি করাতে;
  8. দেশের যেকোনো স্থানে বাণিজ্যিক বা শিল্প কারখানায় গ্যাসের সংযোগ নিতে হলে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসা বাড়ির গ্যাসের সংযোগ নিতে বা আগের সংযোগ বজায় রাখতে;
  9. সিটি করপোরেশন বা সেনানিবাস এলাকায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে হলে;
  10. জমি বা বাড়ি ভাড়া আয়ের ক্ষেত্রে;
  11. সরকার বা সরকারি কোনো সংস্থা, করপোরেশন থেকে বেতন হিসেবে মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা বা বেশি হলেই;
  12. বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন নেয়ার সময়;
  13. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি অংশ বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আয় মাসে ১৬ হাজার টাকার বেশি হলেই;
  14. ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী শহরে ভবন নির্মাণের অনুমোদন চাইলে;
  15. জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলায় কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে;
  16. পেনশন ফান্ড, অনুমোদিত গ্র্যাচুইটি ফান্ড, স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ড, অনুমোদিত সুপারএন্যুয়েশন ফান্ড এবং শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ছাড়া অন্যান্য ফান্ডের রিটার্ন;
  17. সিটি করপোরেশন বা পৌর এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়ন করতে হলে;
  18. ডিজিটাল প্লাটফর্মে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে হলে;
  19. মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অথবা ইলেকট্রনিক উপায়ে অর্থ হস্তান্তরে কমিশন, ফি জাতীয় অর্থ পেতে হলে;
  20. সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় কোন সমিতি বা ক্লাব গঠিত হলে বা এ ধরনের ক্লাবের সদস্য হলে;

এছাড়া আরও সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে

  • ডাক্তার, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি ইত্যাদি পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য হলে বা সদস্য হতে চাইলে;
  • পরামর্শক, ক্যাটারিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জনবল বা নিরাপত্তা সেবা দিয়ে অর্থ গ্রহণ করতে;
  • বিবাহ নিবন্ধক বা কাজী হিসেবে লাইসেন্স পেতে চাইলে;
  • আমদানি-রফতানির সনদ পেতে চাইলে;
  • আমদানির এলসি খুলতে চাইলে;
  • কোম্পানি পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার পদ পেতে হলে;
  • ব্যবসা বা বাণিজ্য সংগঠনের বা সমিতির সদস্যপদ গ্রহণ;
  • বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে তালিকাভুক্তি বা নবায়ন করতে হলে;
  • বীমা বা সার্ভেয়ার হিসেবে নিবন্ধন নিতে হলে;
  • অস্ত্রের লাইসেন্স নেয়ার আবেদন করলে;
  • ওষুধ ব্যবসার জন্য ড্রাগ লাইসেন্স থাকলে বা করাতে চাইলে, অগ্নি-নিরাপত্তা লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিএসটিআই লাইসেন্স পেতে চাইলে;
  • লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলার, কার্গো, বার্জ ইত্যাদি নৌযানের সার্ভে সার্টিফিকেটের জন্য;
  • ইটভাটার অনুমোদন নিতে হলে;
  • পরিবহন সেবার ব্যবসা করলে;
  • কোনো কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর বা এজেন্টশিপ চাইলে;
  • পণ্য সরবরাহের ঠিকাদারি কাজে টেন্ডার জমা দিতে হলে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ দিতে হবে। তাতে ব্যর্থ হলে ৫০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করার প্রস্তাব করা হয়েছে;
  • এনজিও বা মাইক্রো ক্রেডিট সংস্থার জন্য বিদেশি অনুদানের ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে;

ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা শাহনাজ পারভীন সম্প্রতি জমি বিক্রি করে আট লাখ টাকা পেয়েছেন। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র কেনার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু এখন জানতে পেরেছেন, তাকে সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে আয়কর রিটার্ন স্লিপ দিতে হবে, যদিও তার নির্দিষ্ট কোনো আয় নেই।

তিনি বলেন, ‘আমার নিয়মিত কোনো আয় নেই। ব্যাংকের কিছু জমা টাকা থেকে মাসে মাসে যে টাকা পাই, তাকে ইনকাম ট্যাক্স হয় না। যদিও সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য টিআইএন খুলতে হয়েছে। কিন্তু এবার শুনছি, নতুন নিয়মের কারণে এ বছর থেকে আমাকেও রিটার্ন জমা দিতে হবে।’

শাহনাজ পারভীন আরো বলেন, ‘আমার নিয়মিত কোনো আয় নেই। ব্যাংকের কিছু জমা টাকা থেকে মাসে মাসে যে টাকা পাই, তাকে ইনকাম ট্যাক্স হয় না। কিন্তু এখন রিটার্নের পেছনে টাকা দিতে হবে, আইনজীবীকে ফি দিতে হবে।’

সূত্র : বিবিসি

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ৮ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে বিস্তারিত জানতে admin@bdservicerules.info ঠিকানায় মেইল করতে পারেন।

admin has 3010 posts and counting. See all posts by admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *