কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ২০২২-২৩ । গ্রামে ফিরে যাওয়াদের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে ৫০০ কোটি

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ০২২-২০২৩ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। । Agricultural & Rural Credit Policy and Program for the FY 2022-2023 । কৃষি ঋণ বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান কার্যালয় মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রত্যক্ষ এবং পরােক্ষভাবে কৃষি খাতের উপর নির্ভরশীল। বিবিএস এর প্রভিশনাল হিসাবায়ন অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের মােট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১.৫০ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কৃষি খাতের পরােক্ষ অবদান রয়েছে। এছাড়া দেশের মােট শ্রমজীবীর ৪০.৬০ শতাংশ (লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৬-১৭ এর তথ্যানুযায়ী) প্রত্যক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষি খাত খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি সমস্যা সমাধান, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি দেশের অভ্যন্তরীণ মােট উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এমনকি পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মােকাবেলায়ও কৃষির ভূমিকা ব্যাপক। তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষি খাতের চলমান অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এ বিষয়টিতে গুরুত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে দেশ খাদ্যশস্য উপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এছাড়া, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, সবজি ও ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি আজ বিশ্বের দরবারে ঈর্ষণীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। কৃষি খাতের উন্নয়নের কারণে দারিদ্র বিমােচন সহজতর হচ্ছে এবং দেশের মাথাপিছু আয়ও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই দেশের বিস্তৃত গ্রাম বাংলা ও পল্লী অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানাে সম্ভব। এছাড়া, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহের প্রধান লক্ষ্যসমূহ দারিদ্র বিমােচন, ক্ষুধা মুক্তি ও সুস্বাস্থ্য অর্জনের জন্য কৃষি খাতের ধারাবাহিক পরিচর্যার মাধ্যমে এ খাত থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে। দেশের সকল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও প্রয়ােজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ এবং সকল প্রকার শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ইতােমধ্যে জাতীয় কৃষি নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার কর্তৃক গৃহীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) পরিকল্পনায় খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার লক্ষ্যে কৃষি খাতে বৈচিত্রতা আনার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিকরণের পাশাপাশি মৎস্য, ফলমূল, সবজি ও দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির প্রতি অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

কৃষি খাতকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কৃষিবান্ধব উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও দেশের কৃষি খাতকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট সঙ্কটের প্রেক্ষিতে দেশের কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে কৃষকদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিশেষ প্রণােদনামূলক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম ঘােষণা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল হতে ভর্তুকি সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃষি পণ্যের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করার লক্ষ্যে আমদানি বিকল্প ফসলসমূহে ঋণ বিতরণ জোরদারকরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত এসকল পদক্ষেপ দেশের কৃষি খাতকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করছে। কৃষি খাতে ঋণ প্রবাহ ও এ খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রতি অধিক গুরুত্বারােপ করা হচ্ছে। কৃষির আধুনিকীকরণসহ কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়ােজনীয় অর্থের যােগান নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক এবং বর্গাচাষিদের নিকট কৃষি খাতে বিনিয়ােগযােগ্য পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় এ সকল কৃষকের নিকট পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ পৌছে দেওয়ার জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করছে। এর ফলে কৃষকদের মাঝে যথাসময়ে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ও হয়রানিমুক্তভাবে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে। গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাংকসমূহের নতুন শাখা খােলার ক্ষেত্রে শহর ও পল্লী অঞ্চলের জন্য ১৪১ অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও যে সকল এলাকায় পর্যাপ্ত ব্যাংক শাখা নেই সেই সকল এলাকায় উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, ব্যাংক-এমএফআই পার্টনারশিপ এবং কন্ট্রাক্ট ফার্মিং সুবিধার মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির অনুসরণের আলােকে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পরও কৃষি খাত উন্নয়নের জন্য আরও উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। করােনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে উঠে কৃষক পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, বাণিজ্যিক কৃষির গতি বৃদ্ধি করা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আয়উত্সারী কর্মকাণ্ড চলমান রাখা, কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের কৃষির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব যথা- বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও এর কারণে সৃষ্ট বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা ইত্যাদিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে সৃষ্ট সংকট দূরীকরণের জন্যও প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত অপরিহার্য। বাংলাদেশের কৃষি খাতের সার্বিক উন্নয়নে কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদের নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণী প্রদান, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ সরবরাহ, এলাকাভিত্তিক জলবায়ু ও পরিবেশ উপযোগী ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, সমুদ্র অঞ্চলে কৃষি কর্মকান্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করী প্রয়োজন।

এ প্রেক্ষিতে, উদ্ভূত সমসমিয়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচির মূল দিকগুলো ঠিক রেখে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালায় যে সকল নতুন বিষয় সংযোজন কী হয়েছে তার মধ্যে দবদ্ধভাবে কৃষি ঋণ বিতরণের পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তকণ, কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ও এর আওতা বৃদ্ধিকরণ, প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ বিতরণের উদ্দেশাে ঘঁসি পলিরে ঋণ নিয়মচিীর সংযোজন, ঋণ নিয়মচিীরের এক প্রতি ঋণ সীমা বৃদ্ধিকরণ, সামুদ্রিক শৈবালসহ বিভিন্ন নতুন ফল ও ফসলের ঋণ নিয়মচির সংযোজন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কৃষকবান্ধব ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তােলা এ নীতিমালা প্রণয়নের প্রধান লক্ষ্য। কৃষি ও পল্লী ঋণ কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোর করণীয় সম্পর্কে এ নীতিমালায় বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। এ নীতিমালা কাঙ্খিত কৃষি উৎপাদনে সহায়তার পাশাপাশি কৃষকদের অনুকূলে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, পল্লী অঞ্চলের জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়ন এবং কৃষি খাতে কোভিড়-১৯ এর নেিিচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায় ।

 

কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচী ২০২২-২৩ । গ্রামে ফিরে যাওয়াদের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে ৫০০ কোটি: ডাউনলোড

Leave a Reply

Your email address will not be published.