চাকরিচ্যুত হলে কি মামলা করা যাবে?

সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপীল বিধিমালা, ২০১৮ মোতাবেক দ্বিতীয় শ্রেণীর (নন-গেজেটেড) অথবা তৃতীয় অথবা চতুর্থ শ্রেনীর একজন চাকুরে মনোনীত কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন এবং শাসনিক ট্রাইবুনালে মামলা করা যাবে।

অথবা

নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে ৬ নং বিধির ২ নং উপবিধির আলোকে প্রজ্ঞাপন সূত্রে গঠিত সুনির্দিষ্ট চাকরি বিধি প্রনয়ণকারী কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করতে পারবেন। শর্ত থাকে যে, সশস্ত্র বাহিনী সদর দপ্তরে কর্মরত কোনো ব্যক্তি (বেসামরিক) তার উপর এ ধরণের প্রদত্ত আদেশে যেখানে প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা (বর্তমানে মহাপরিচালক) নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সেই ক্ষেত্রে তার মূল আদেশের বিরুদ্ধে তিনি সচিব কিংবা যুগ্ম সচিবের কাছে আপিল করতে পারবেন।

শুধু মাত্র বেসামরিক কর্মচারী (Civil servant) জন্য এই নিয়ম কানুন প্রযোজ্য হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাসমূহে কর্মরত বেসামরিক কর্মচারীগণ চাকরিচ্যুত হলে কি করবেন? প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাসমূহে কর্মরত বেসামরিক কর্মচারীগণ কোনো অপরাধ করলে বা কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিধিমালা ১৯৬১ অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম শুরু ও শেষ করা হয়। এই প্রজ্ঞাপনটি জারী করা হয় পাকিস্তান আমলে। তারিখ: রাওয়ালপিন্ডি, ২৫ জুলাই ১৯৬১।


বিধিমালা ১৯৬১-তে চারটি অধ্যায় আছে। যথা: প্রথম অধ্যায়-সাধারণ, দ্বিতীয় অধ্যায়-শ্রেণি বিন্যাস, তৃতীয় অধ্যায়- আচরণ এবং শৃংখলা, চতুর্থ অধ্যায়- আপিল সংক্রান্ত। তবে আচরণ এবং শৃংখলা ও আপিল এর নিয়মাবলী সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এবং সংশোধিত ২০১৮ এর মতোই।


বিধিমালা ১৯৬১-এই বিধিমালায় কোন সরকারি কর্মচারীর অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়া এবং অপরাধ বা অপরাধসমূহের গুরুত্ব অনুসারে তাকে কি ধরনের শাস্তি প্রদান করা হবে তার বিধান রয়েছে। এতে আপীল, পুনঃতদন্ত ও পুনর্বিচার প্রক্রিয়াও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ বিধিতে অসদাচরণের সংজ্ঞা দিয়ে বলা হয়েছে যে, স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বা চাকুরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী বা আচরণবিধিতে বর্ণিত যেকোন শর্ত লঙ্ঘন অথবা কোন কর্মকর্তা বা ভদ্রলোকের জন্য শোভনীয় নয় এমন কোন আচরণ অসদাচরণ বলে বিবেচিত হবে। এ ছাড়াও অসদাচরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে:

(১) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসম্মত নির্দেশ অমান্য করা;

(২) কর্তব্যকর্মে অবহেলা;

(৩) আইনসঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে সরকারি কোন আদেশ, বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশপত্রের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন এবং

(৪) কোন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে যেকোন কর্তৃপক্ষের কাছে অসৌজন্যমূলক, বিভ্রান্তিকর, ভিত্তিহীন বা তুচ্ছ বিষয়ে অভিযোগ পেশ করা।


এই বিধিতে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রগুলি হচ্ছে অযোগ্যতা, অসদাচরণ, ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি, দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রম। শাস্তির প্রকৃতি দু ধরনের। প্রথমটি লঘু শাস্তি এবং দ্বিতীয়টি গুরু ধরনের। লঘু শাস্তি হলো সাধারণত তিরস্কার করা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখা, দক্ষতা সীমা অতিক্রমের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং তা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে অযোগ্য করে রাখা, অবহেলা বা আদেশ অমান্য করার কারণে ঘটিত সরকারের আর্থিক কোন ক্ষতি কর্মচারীর বেতন বা গ্রাচ্যুইটি থেকে সম্পূর্ণ বা আংশিক আদায় করা এবং বেতনের টাইমস্কেল নিম্নতর স্তরে অবনমিত করা। গুরু ধরনের শাস্তি হলো পদাবনতি বা বেতন হ্রাস, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, চাকুরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করা। এ বিধির আওতায় বরখাস্ত করা হলে ওই কর্মচারী ভবিষ্যতে অন্য কোন সরকারি চাকুরিতে অথবা কোন আইন বলে বা আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত কোন সংস্থায় নিয়োগ লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে চাকুরি থেকে অপসারিত হলে কর্মচারী পুনর্নিয়োগ লাভের অযোগ্য হবেন না।


সুনির্দিষ্ট কোন অপরাধে কি ধরনের শাস্তি প্রযোজ্য তা এই বিধিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অদক্ষতার দায়ে তিরস্কার ও বরখাস্ত ছাড়া যেকোন শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে অথবা অদক্ষতার প্রকারভেদে বরখাস্ত ব্যতীত অন্য যেকোন শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। অসদাচরণ এবং দুর্নীতি বা নাশকতামূলক অপরাধে লঘু বা গুরু উভয় ধরনের যেকোন শাস্তি এবং পদাবনতি বা বেতন হ্রাস ব্যতীত যেকোন গুরু দন্ড প্রদান করা যেতে পারে।

আমি এখানে আপিল ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করবো।

আপনি বেসামরিক কর্মচারী কোনো কারনে চাকরিচ্যুত হয়ে যদি সংক্ষুব্ধ হোন তাহলে প্রথমে আপিল করতে হবে।


বিধিমালা ১৯৬১ অনুযায়ী আপিল আবেদন করার নিয়মাবলী:
বিধিমালা ১৯৬১ এর ১৭ (১) উপবিধিতে বর্ণিত আছে যে, এই বিধিমালার আওতায় যে কোনো ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে একটি মাত্র আপিল আবেদন করার অধিকারী হবেন-


(ক) ৮ নং বিধির আওতায় প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট যে কোনো একটি শাস্তি। তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার পাইবেন না তবে তিনি সেই আদেশের পুন:বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারবেন। (২) (ক) প্রথম শ্রেণির একজন চাকুরে মনোনীত কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির নিকট আপিল করতে পারবেন। (খ) দ্বিতীয় শ্রেণির একজন চাকুরে তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে সচিব কিংবা যুগ্ম সচিব বরাবরে আপিল করতে পারবেন। তবে সচিব বা যুগ্ম সচিব তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলে তাকে রাষ্ট্রপতি বরাবরই আপিল করতে হবে। (গ) দ্বিতীয় শ্রেণীর (নন-গেজেটেড) অথবা তৃতয়ি অথবা চতুর্থ শ্রেণির একজন চাকুরে মনোনীত কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন অথবা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে ৬ নং বিধির ২ নং উপবিধির আলোকে প্রজ্ঞাপন সূত্রে গঠিত সুনির্দিষ্ট চাকরি বিধি প্রনয়ণকারী কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করতে পারবেন।


শর্ত থাকে যে, সশস্ত্র বাহিনী সদর দপ্তরে কর্মরত কোনো ব্যক্তি (বেসামরিক) তার উপর এ ধরণের প্রদত্ত আদেশে যেখানে প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা (বর্তমানে মহাপরিচালক) নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সেই ক্ষেত্রে তার মূল আদেশের বিরুদ্ধে তিনি সচিব কিংবা যুগ্ম সচিবের কাছে আপিল করতে পারবেন।


১৯। প্রত্যেক আগ্রহী আপিলকারী আলাদাভাবে নিজ নামে আপিল দায়ের করতে পারবেন।


২০। এই বিধির আওতায়কৃত আপিল যৌক্তিক এবং অসম্মানজনক বা অবাঞ্চিত ভাষা বিবর্জিত ও পূর্ণাঙ্গ হতে হবে। যে কোনো আপিল দপ্তর প্রধানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে যে দপ্তরে আবেদনকারী কাজ করেছেন এবং করতেন এবং সেই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হচ্ছে।


সমস্যা হচ্ছে: আইনে বলা আছে, যে কোনো আপিল দপ্তর প্রধানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে যে দপ্তরে আবেদনকারী কাজ করেছেন এবং করতেন। দেখা যাচ্ছে- আপনি যে দপ্তরে কাজ করতেন সেই দপ্তরেই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে অর্থাৎ সেই দপ্তর প্রধান আপনাকে লঘু দন্ড বা গুরু দন্ড দেয়ার সুপারিশ করে বিভাগীয় প্রধানের নিকট সুপারিশ নামা প্রেরণ করার পরই আপনার চাকরি চলে গেলো। আর আপনি যখন আপিল করবেন তখন কিন্তু সকলের বিরদ্ধে কথাগুলো চলে আসে। আবার সেই দপ্তর প্রধানের মাধ্যমে আপিল আবেদন প্রেরণ করতে বলা হয়েছে। দেখা যায়, আপিল আবেদন দপ্তর প্রধানের নিকট প্রেরন করলে তিনি যখন দেখেন যে, কথাগুলো তার বিরুদ্ধে তখন সেই আপিল আবেদন তার দপ্তরেই পড়ে থাকে। আপিল কর্তৃপক্ষের নিকট সহজে প্রেরণ না করে সময় লস করেন।


এ পরিস্থিতিতে নিয়ম হচ্ছে: এক সেট আপিল আবেদন দপ্তর প্রধানের নিকট প্রেরণ করতে হবে আর এক সেট সরাসরি আপিল কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করতে হবে।
আপিল আবেদন করার সময় সীমা: আপনি যে তারিখে চাকরিচ্যুত হবেন সেই তারিখ থেকে ০৬ মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে। উক্ত আইনটি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ তে উল্লেখ আছে কিন্তু সংশোধিত ২০১৮ তে উক্ত সময় সীমা ০৩ মাস করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে যে, উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে আর আপিল কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী তিন মান তিনি বিবেচনা করতে পারেন।

আপিল করার পরবর্তী করণীয় কি? না জানলে সব ব্যর্থ

আপিল করার পর দেখা যায়, আপিল কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া শব্দ নেই। বছরের পর বছর তার দপ্তরে আপিল আবেদন পড়ে থেকে কাগজের পাতাগুলো উইপোকায় নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি অবহেলিত। কেউ আর আপনার কথা শোনে না। যাই হোক দশ পনেরো বছর পর রায় হলো, হয় চাকরি ফিরে পেয়েছেন না হয় আপিল খারিজ বা নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। রায় পাওয়ার পর আপনি কোনো উকিলের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলবেন হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। রিট মামলা করলে বিচারক বলবেন আপনার এই মামলা আগে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে করতে হবে। প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে গেলে বিচারক বলবেন এতো বছর পর কেনো এলেন। এভাবে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে করতে হার্ট এ্যাটাক তারপর মৃত্যু।


আসল নিয়ম হচ্ছে: যে নিয়মটা বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ এ্যাডভোকেটও জানে না। আর বেসামরিক লোকজনের শতকরা ৯৮ ভাগ না জানার কারনে সব হারিয়ে রাস্তা রাস্তায় পাগল হয়ে ঘুরে বেড়ায়।


আসল কথায় আসি। আপনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল আবেদন করার পর দুই মাসের মধ্যে যদি কোনো উত্তর না আসে, তার পরের ছয় মাসের মধ্যে মোট ০৮ মাসের মধ্যে আপনাকে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করতে হবে। প্রশাসনিক ট্রাইবুনালের সর্বশেষ সংশোধনীতে বলা হয়েছে যে, উত্তর প্রদান করুক আর নাই করুক ০৮ মাসের মধ্যে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে মামলা করতে হবে।


আপিল করার পরে আপিল চলাকালীন ০৮ মাসের মধ্যে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে যে মামলা করতে হয় এই নিয়মটাই ৯৫% উকিলগণই জানেন না। তারা শুধুই বলেন হাইকোর্টে রিট করেন।


যাই হোক প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল আর প্রশাসনিক আপিল ট্রাইবুনাল কি তা একটু জেনে নেই।

admin

আমার ব্লগের কোন কন্টেন্ট সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে বা জানাতে ইমেইল করতে পারেন admin@bdservicerules.info ঠিকানায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.