প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেল ২০২৫ । বৈষম্যের ‘হিমালয়’ গড়ার আয়োজন করেছে পে কমিশন?
নতুন পে-স্কেল ২০২৫-এর একটি খসড়া চার্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। প্রস্তাবিত এই কাঠামোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বেতনের ব্যবধান এতটাই বেশি যে, একে ‘অমানবিক’ এবং ‘চরম বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈষম্যের চিত্র: সংখ্যা যখন কথা বলে
প্রস্তাবিত চার্টটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-১০ পর্যন্ত প্রথম ১০টি গ্রেডের সুযোগ-সুবিধা যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, তার তুলনায় গ্রেড-১১ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীরা প্রায় উপেক্ষিত।
উচ্চস্তরের উল্লম্ফন: গ্রেড-১ থেকে ১০ পর্যন্ত ১০টি গ্রেডের মধ্যে বেসিকের মোট পার্থক্য দেখানো হয়েছে ১,২৮,০০০ টাকা। যেখানে ১ নম্বর গ্রেডের প্রস্তাবিত মূল বেতন ১,৬০,০০০ টাকা, সেখানে ১০ নম্বর গ্রেডে তা মাত্র ৩২,০০০ টাকা।
নিম্নস্তরের অবহেলা: সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা যায় নিচের ১০টি গ্রেডে (গ্রেড-১১ থেকে ২০)। এই ১০টি স্তরের কর্মচারীদের বেতনের মোট পার্থক্য মাত্র ৫,০০০ টাকা! অর্থাৎ, ১০টি ধাপ পার হয়েও একজন কর্মচারী মাত্র ৫ হাজার টাকার ব্যবধান ঘোচাতে পারছেন।
প্রবৃদ্ধির হার: যেখানে উপরের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির হার গড়ে ১৫% থেকে ২৯% পর্যন্ত, সেখানে নিচের দিকে অনেক ক্ষেত্রে তা ২%-এর নিচে নেমে এসেছে।
মুদ্রাস্ফীতির বাজারে জীবন যখন ওষ্ঠাগত
বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে ২০,০০০ বা ২৫,০০০ টাকা মূল বেতনে একটি পরিবারের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা অসম্ভব। সমালোচকরা বলছেন, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য হাজার হাজার টাকার ব্যবধান রাখা হয়েছে, সেখানে প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য মাত্র ৫০০ বা ৩০০ টাকার ইনক্রিমেন্ট (বৃদ্ধি) কৌতুকের সমতুল্য।
“নিচের স্তরের ১০টি গ্রেডের মানুষের জীবন কি মাত্র ৫,০০০ টাকার ব্যবধানে বদলে যাবে? এই পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য সাধারণ কর্মচারীদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিচ্ছে।”
আন্দোলনের সুর ও দাবি
সাধারণ কর্মচারীদের দাবি, অবিলম্বে এই বৈষম্যমূলক চার্ট সংশোধন করতে হবে। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো: ১. উচ্চস্তর ও নিম্নস্তরের বেতনের ব্যবধান কমিয়ে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা। ২. মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিম্ন গ্রেডগুলোর মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা। ৩. জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট এবং অন্যান্য ভাতা প্রদান করা।
বাস্তবায়নের আগে যদি এই বিশাল ব্যবধান কমানো না হয়, তবে সরকারি দপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উচু তলার সাথে নিচু গ্রেডের বৈষম্য এত বেশি কেন?
উঁচু তলার সাথে নিচু গ্রেডের এই আকাশচুম্বী বৈষম্য কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে আপনার দেওয়া ২০২৫-এর প্রস্তাবিত চার্টে এটি আরও প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। এই বৈষম্যের পেছনে মূলত কয়েকটি কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে:
১. শতাংশ (Percentage) ভিত্তিক বৃদ্ধির ফাঁদ
বেতন যখন শতাংশের ভিত্তিতে বাড়ে, তখন বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়।
উদাহরণ: ধরুন, সবার বেতন ১০% বাড়ল। যার মূল বেতন ৮০,০০০ টাকা, তার বাড়বে ৮,০০০ টাকা। আর যার মূল বেতন ১০,০০০ টাকা, তার বাড়বে মাত্র ১,০০০ টাকা।
ফলে প্রতিবার পে-স্কেল আসার পর উপরের এবং নিচের স্তরের টাকার ব্যবধান কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
২. ব্রিটিশ আমলের ‘কলোনিয়াল’ কাঠামো
আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অনেকটা ব্রিটিশ আমলের আমলাতান্ত্রিক ধারা অনুসরণ করে। যেখানে নীতি-নির্ধারক বা কর্মকর্তাদের জন্য বিলাসবহুল জীবন নিশ্চিত করা এবং নিচের স্তরের কর্মচারীদের কেবল ‘টিকে থাকার’ মতো বেতন দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। একে বলা হয় ‘এলিট বায়াস’ (Elite Bias), যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নিজেদের সুবিধাকেই প্রাধান্য দেন।
৩. জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভুল মূল্যায়ন
নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় মনে করেন, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য অনেক বেশি খরচ প্রয়োজন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, চাল, ডাল, তেল বা ওষুধের দাম একজন সচিব এবং একজন পিয়নের জন্য একই। বরং আয়ের বড় অংশই প্রান্তিক কর্মচারীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে খরচ হয়ে যায়, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে তাদের জন্য বেঁচে থাকাই কঠিন করে তোলে।
৪. গ্রেড ভিত্তিক পার্থক্যের বিশাল ফারাক
আপনার দেওয়া চার্টটি দেখলেই বোঝা যায়:
১০টি উপরের গ্রেডে ব্যবধান রাখা হয়েছে ১,২৮,০০০ টাকা।
১০টি নিচের গ্রেডে ব্যবধান মাত্র ৫,০০০ টাকা। এর মানে হলো, নিচের দিকে একজন কর্মচারী পদোন্নতি পেলেও তার আর্থিক অবস্থায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে না। এটি কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়।
৫. সক্ষমতার দোহাই
সরকার প্রায়ই যুক্তি দেয় যে, নিচের গ্রেডে কর্মচারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সেখানে বেতন সামান্য বাড়ালেও সরকারের ওপর বিশাল বাজেটের চাপ পড়ে। অথচ উপরের গ্রেডে লোকসংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে বড় অংকের বেতন বাড়ানো সহজ হয়। কিন্তু এই ‘বাজেট সাশ্রয়’ করতে গিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়।
উপসংহার: প্রস্তাবিত ২০২৫-এর এই চার্ট যদি কার্যকর হয়, তবে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র হবে। যেখানে মুদ্রাস্ফীতি ১০% এর ওপরে, সেখানে নিচের গ্রেডগুলোতে মাত্র ১% বা ২% প্রবৃদ্ধি আসলে তাদের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেওয়ার নামান্তর।



