আগে প্রজ্ঞাপন, পরে নির্বাচন : ৩১ জানুয়ারির মধ্যে নতুন পে স্কেলের আল্টিমেটাম
সরকারি চাকুরিজীবীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বেতন বৈষম্য নিরসনে এবার কঠোর অবস্থানের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারী প্রতিনিধিরা। “আগে প্রজ্ঞাপন, পরে নির্বাচন”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদের মূল বিশ্লেষণ:
চূড়ান্ত সময়সীমা (Deadline): সরকারি চাকুরিজীবীদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে ৩১ জানুয়ারিকে ‘ডেডলাইন’ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন আর কালক্ষেপণ সহ্য করা হবে না।
দুর্নীতিমুক্ত জীবনযাপনের অঙ্গীকার: আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ বলছেন, যারা চাকরিতে থেকে ‘হারাম’ বা ঘুষ না খেয়ে সততার সাথে জীবন নির্বাহ করতে চান, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে ন্যায্য বেতন কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই।
ঐক্যবদ্ধ অবস্থান: সরকারের সব ডিপার্টমেন্টের চাকুরিজীবীদের এখন ব্যক্তিগত বা বিভাগীয় স্বার্থ ভুলে এক কাতারে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। দাবি আদায়ে ‘আরও শক্ত অবস্থান’ নেওয়ার বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচন ও প্রজ্ঞাপন: আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা আগে বেতন কাঠামোর নিশ্চয়তা বা প্রজ্ঞাপন দেখতে চান। তাদের মতে, এটি কেবল একটি দাবি নয়, বরং বেঁচে থাকার অধিকার।
বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় কোনো বেতন বৃদ্ধি না হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকুরিজীবীদের মধ্যে এই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখন দেখার বিষয়, ৩১ জানুয়ারির এই আল্টিমেটামের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
অংশীজনের মতামতে তৈরি বাস্তবসম্মত পে-কমিশন রিপোর্ট: প্রশ্ন যখন ‘অর্থের উৎস’ ও ‘মূল্যস্ফীতি’
দীর্ঘ এক দশকের প্রতীক্ষা শেষে চূড়ান্ত হয়েছে নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন। গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কমিশন তাদের এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রায় দুই হাজার ৫শর বেশি অংশীজনের সরাসরি মতামত এবং ১৮৪টি সভার মাধ্যমে তৈরি করা এই রিপোর্টকে চাকুরিজীবীরা ‘বাস্তবতার প্রতিফলন’ হিসেবে দেখলেও, কতিপয় গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণায় জনমনে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
প্রতিবেদনের ভিত্তি ও বাস্তবতা: পে-কমিশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১১ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। এই কঠিন বাস্তবতায় যারা সৎভাবে জীবনযাপন করতে চান, তাদের জন্য বর্তমান বেতন কাঠামোতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমিশন অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা মূল বেতনের সুপারিশ করেছে।
গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকা ও সমালোচনা: দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বেতন কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা এবং সংবাদমাধ্যম নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ শুরু করেছে। তাদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন—”টাকা কোথা থেকে আসবে?” এবং “পে-স্কেল দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে”। চাকুরিজীবী মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যখন উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়, তখন অর্থের উৎস নিয়ে কথা ওঠে না কেন? কেবল কর্মচারীদের পে-স্কেলের বেলাতেই কি তবে যত বাজেট ঘাটতির অজুহাত?
মূল্যস্ফীতির দোহাই কতটুকু যৌক্তিক? অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, বাজারের সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার কারণে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী, কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন বৃদ্ধির কারণে নয়। ১১ বছর পর বেতন বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও তা কর্মচারীদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হবে। একে মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে প্রচার করাকে কর্মচারীদের বঞ্চনার একটি অপকৌশল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাকুরিজীবীদের প্রত্যাশা: সাধারণ সরকারি কর্মচারীরা মনে করেন, কমিশন বাস্তবতার নিরিখেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন সরকারের উচিত পত্রপত্রিকার প্রপাগান্ডায় কান না দিয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা। ন্যায্য পাওনা আদায়ে চাকুরিজীবীরা এখন ঐক্যবদ্ধ এবং তারা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছেই চূড়ান্ত গেজেট আশা করছেন।


