সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষায় বড় পরিবর্তন: সংশোধিত নীতিমালা জারি
সরকারি কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতিমালা, ২০২৩’-এ গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনেছে সরকার। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক বিশেষ গেজেটের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। নতুন এই নীতিমালায় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ হ্রাস, প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বয়সসীমায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে নতুন নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, সকল ক্যাডার কর্মকর্তা এবং নবনিযুক্ত নন-ক্যাডার কর্মচারীদের চাকরিতে যোগদানের দুই বছরের মধ্যে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মেয়াদ হ্রাস: আগে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৬ মাস থাকলেও এখন তা কমিয়ে ৪ মাস করা হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে সংযুক্তি: প্রশিক্ষণের একটি নির্দিষ্ট সময় কর্মকর্তাদের স্থানীয় প্রশাসন ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সাথে সরাসরি কাজ করতে হবে, যাতে তারা জনসেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
সর্বোচ্চ বয়সসীমা: ক্যাডার বহির্ভূত এবং নন-ক্যাডার থেকে ক্যাডার পদে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় বয়সসীমা ও শর্তাবলি
সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ বাড়াতে বয়সসীমায় শিথিলতা আনা হয়েছে।
মাস্টার্স ও পিএইচডি: পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা, মাস্টার্স, এমফিল এবং পিএইচডি অর্জনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৪৭ বছর করা হয়েছে।
কর্মকালীন উচ্চশিক্ষা: যারা চাকরিরত অবস্থায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবেন, তাদের জন্য এই বয়সসীমা ৫০ বছর।
গবেষণা ও ফেলোশিপ: পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ, ফেলোশিপ ও মেন্টরশিপের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫৪ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
কঠোর মনিটরিং: পিএইচডি গবেষণারত কর্মকর্তাদের প্রতি বছর সুপারভাইজারের কাছ থেকে অগ্রগতি সনদ সংগ্রহ করে নিজ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বেতন বন্ধ রাখার বিধান রাখা হয়েছে।
বার্ষিক ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক
দক্ষতা বজায় রাখতে প্রতিটি সরকারি দপ্তরকে তাদের সকল কর্মচারীর জন্য প্রতি অর্থবছরে ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। এছাড়া বছরে অন্তত একবার ‘দক্ষতা নবায়ন প্রশিক্ষণ’ আয়োজন করা হবে, যার মূল লক্ষ্য হবে দাপ্তরিক জ্ঞান হালনাগাদ করা এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বিদেশ ভ্রমণ ও উচ্চশিক্ষায় কড়াকড়ি
নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, পিআরএল (PRL) শুরু হওয়ার আগে কমপক্ষে ৪ সপ্তাহ চাকরির মেয়াদ না থাকলে কোনো কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে পারবেন না। এছাড়া দেশের ভেতরে যে সব ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ আছে, সেগুলোর জন্য বিদেশে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়
এই নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি ‘জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিল’ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (BPATC)-কে এই খাতের ‘অ্যাপেক্স বডি’ বা সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংশোধনীর ফলে একদিকে যেমন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণের জট কমবে, অন্যদিকে আধুনিক ও দক্ষ স্মার্ট প্রশাসন গড়ে তোলা সহজ হবে।




