প্রতিবাদলিপি: পদবি বৈষম্য ও ‘সচিবালয় ভাতা’র আশঙ্কা
৩০ বছরের পুরনো বৈষম্য নিরসন না হলে দপ্তর ও সংস্থা সমূহে কমপ্লিট শাটডাউন এর হুঁশিয়ারি-১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় এবং এর আওতাধীন দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থা সমূহের কর্মচারীদের মধ্যে চলে আসা পদবি বৈষম্য নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দপ্তর ও সংস্থার নেতারা। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে সচিবালয়ের নেতৃত্ব স্থানীয় কর্মকর্তারা এই বৈষম্য সৃষ্টি করেন, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। এই বৈষম্যকে অনেকে ‘ব্রাহ্মণ’ ও ‘নমঃশূদ্র’ শ্রেণির কর্মচারীদের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে সচিবালয়ের কর্মচারীদের ‘ব্রাহ্মণ’ এবং দপ্তর ও সংস্থার কর্মচারীদের ‘নমঃশূদ্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
⏳ বৈষম্যের ইতিহাস: ১৯৯৫ থেকে ২০২৫
দপ্তর ও সংস্থার কর্মচারীরা বলছেন, বিগত ৩০ বছরে বারবার সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হলেও, কেউ এর নিরসনে কার্যকর ভূমিকা নেননি। তাদের অভিযোগ, সচিবালয়ের কর্মকর্তারা কেবল নিজেদের কর্মচারীদের ভাগ্য পরিবর্তনের দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন।
⚠️ ‘সচিবালয় ভাতা’র আশঙ্কা ও আন্দোলনের ডাক
বর্তমানে, ২০২৫ সালে এসে, যদি ‘সচিবালয় ভাতা’ নামে নতুন কোনো আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়, তবে দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থা সমূহের কর্মচারীরা কঠোর আন্দোলনের পথে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাদের দাবি, যদি কোনো ভাতা প্রদান করতে হয়, তবে তা সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে দপ্তর ও সংস্থার কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে কোনো নতুন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ দেওয়ার এবং সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন।
✊ প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি
এই বৈষম্য নিরসনের জন্য এবং নতুন করে কোনো বৈষম্য সৃষ্টির প্রতিবাদে দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থার সকল কর্মচারী সংগঠনকে তাদের প্যাডে লিখিত প্রতিবাদ লিপি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্দোলনের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে: “আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।”
দপ্তর ও সংস্থার কর্মচারীরা মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা স্যারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন ‘সোনার বাংলায়’ আর কোনো বৈষম্য সৃষ্টি না হয় এবং তিনি যেন এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে নজর দেন।

সচিবালয় এবং মাঠ পর্যায়ের অফিস গুলোর সুযোগ সুবিধায় এত বৈষম্য কেন?
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ। সচিবালয় এবং মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোর (দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থা) সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্যের পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
এখানে প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
১. 🛡️ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর প্রভাব ও আধিপত্য
নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রে অবস্থান: সচিবালয় হলো সরকারের নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রবিন্দু। মন্ত্রণালয়/বিভাগগুলো সরকারের নীতি, আইন এবং বিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে, সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তারা (বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের) ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই নীতি নির্ধারণে এবং নিজেদের জন্য সুবিধা আদায়ে বেশি প্রভাবশালী হন।
‘Generalist vs. Specialist’ দ্বন্দ্ব: সাধারণত সচিবালয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা (Generalist) নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করেন, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো (যেমন প্রকৌশলী, ডাক্তার, কৃষিবিদ ইত্যাদি Specialist ক্যাডার ও নন-ক্যাডার) সেই নীতি বাস্তবায়ন করে। নীতিনির্ধারণী ভূমিকা থাকার কারণে জেনারেলিস্টদের প্রভাব বেশি থাকে এবং তারা প্রায়শই পদোন্নতি, পদবি ও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।
২. 💰 আর্থিক ও সুবিধাগত বৈষম্য
বিশেষ সুবিধা ও ভাতা: আপনার বক্তব্যে যেমন ‘সচিবালয় ভাতা’-এর উল্লেখ রয়েছে, তেমনি অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সচিবালয়কেন্দ্রিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা (যেমন: উন্নতমানের আবাসন, ঋণ সুবিধা, গাড়িসেবার নগদায়ন/ঋণ সুবিধা ইত্যাদি) সৃষ্টি বা সহজলভ্য করা হয়েছে, যা মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হয়নি।
পদবি ও বেতন গ্রেডের পার্থক্য: বিভিন্ন সময়ে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদবি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও, মাঠ পর্যায়ের অনুরূপ পদের কর্মচারীদের জন্য সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়নি বা দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। যেমন, সচিবালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে উচ্চ গ্রেড (যেমন: সহকারী সচিব) পর্যন্ত যেতে পারলেও, মাঠ পর্যায়ের সমমানের কর্মচারীদের পদোন্নতির সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম বা সীমিত।
৩. 📢 দর কষাকষি এবং রাজনৈতিক প্রভাব
শক্তিশালী লবিং: সচিবালয়ের কর্মকর্তারা যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্রে কাছাকাছি থাকেন, তাই দাবি-দাওয়া উত্থাপন ও তা দ্রুত আদায়ের জন্য তাদের ঐক্যবদ্ধতা ও লবিং ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী।
আন্দোলনের কেন্দ্র: সচিবালয়ই যেহেতু কেন্দ্রীয় প্রশাসন, তাই এখানকার কর্মীদের কোনো দাবি উঠলে বা আন্দোলন করলে তা সরকারের উচ্চ মহলে দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণ করে। পক্ষান্তরে, মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের আন্দোলন বা দাবি ঢাকায় পৌঁছানো ও প্রভাব ফেলা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
৪. 📜 আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
নিয়োগ বিধিমালার পার্থক্য: সচিবালয় এবং মাঠ পর্যায়ের দপ্তর/সংস্থাগুলোর জন্য প্রায়শই পৃথক নিয়োগ বিধিমালা ও সার্ভিস রুলস থাকে। বৈষম্য নিরসনের অর্থ হলো এই বিশাল সংখ্যক কর্মচারীর পদবি ও বেতন গ্রেডের পরিবর্তন করা, যা সরকারের ওপর আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করে এবং আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এই পরিবর্তনগুলো আটকে থাকে।
এই বৈষম্য নিরসন করে একটি ‘বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ’ এবং ‘সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য সমতা’ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।



