ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিল ইসি
১১ ডিসেম্বর ২০২৫: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) । বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, তারিখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে ‘নির্বাচন অগ্রাধিকার’ ও ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ।
আইনগত ভিত্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া:
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৭-এর দফা (১) ও (২) এবং গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ৫ অনুযায়ী এই কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ।
প্রজ্ঞাপনে সংযুক্ত তফসিলের মাধ্যমে নির্বাচনি এলাকাসমূহের জন্য রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের নিয়োগ দেওয়া হয় ।
বেশিরভাগ নির্বাচনি এলাকার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকদের (জেলা প্রশাসক) রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ।
অন্যদিকে, সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে সাধারণত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), উপজেলা নির্বাচন অফিসার অথবা থানা নির্বাচন অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।
যেমন, পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, দিনাজপুর-১, নীলফামারী-১, রংপুর-১, কুড়িগ্রাম-১, গাইবান্ধা-১, জয়পুরহাট-১, বগুড়া-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, নওগাঁ-১, রাজশাহী-১, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-২, পাবনা-১, মেহেরপুর-১, কুষ্টিয়া-১, চুয়াডাঙ্গা-১ এবং ঝিনাইদহ-১ সহ বেশ কিছু সংসদীয় আসনের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরাই রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা পালন করবেন ।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও অনুলিপি প্রেরণ:
নির্বাচন কমিশনের আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন ।
প্রজ্ঞাপনটি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, মহাপুলিশ পরিদর্শক, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে ।
ওয়েব সাইটে প্রকাশের অনুরোধসহ সিস্টেম ম্যানেজার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, ঢাকা-কেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ।
এছাড়া, বিষয়টি নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ)-কে অনুরোধ করা হয়েছে ।
রিটার্নিং অফিসার হওয়ার যোগ্যতা কি?
রিটার্নিং অফিসার হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা আইনে সরাসরি উল্লেখ করা না থাকলেও, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে এই পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে। যোগ্যতা বলতে এখানে মূলত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদমর্যাদা ও সরকারি চাকুরীর অভিজ্ঞতা বোঝানো হয়।
সাধারণত, রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন:
১. পদমর্যাদা: * জেলা প্রশাসক (District Commissioner/DC): বেশিরভাগ সংসদীয় আসনের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকগণকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। * বিভাগীয় কমিশনার: ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীস্থ নির্বাচনি এলাকার জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারগণকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হয়। * আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা: কিছু ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকেও রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
২. আইনগত ভিত্তি: * গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (Representation of the People Order, 1972)-এর অনুচ্ছেদ ৭(১) এবং (২): এই আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচন পরিচালনার উদ্দেশ্যে যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার হিসাবে নিয়োগ দিতে পারে। * গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ (Referendum Ordinance, 2025)-এর ধারা ৫: এই আইন অনুযায়ী গণভোট পরিচালনার জন্যও একই কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে গণ্য করা হয়।
মূল কথা হলো, রিটার্নিং অফিসার মূলত নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রেষণে নিযুক্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা (সাধারণত উচ্চপদস্থ) যিনি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার নির্বাচন সংক্রান্ত সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ব্যক্তিটি কোন নির্দিষ্ট ডিগ্রির অধিকারী হতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই; বরং তিনি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকলেই নির্বাচন কমিশন তাঁকে নিয়োগ দিতে পারে।
রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা কি?
রিটার্নিং অফিসারকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই ক্ষমতাগুলি আইন ও বিধিমালা অনুসারে প্রযুক্ত হয় এবং নির্বাচনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
রিটার্নিং অফিসারের মূল ক্ষমতা ও দায়িত্বসমূহ নিম্নরূপ:
১. নির্বাচন পরিচালনায় সর্বময় ক্ষমতা:
নির্বাচনী কার্যাবলি পরিচালনা: তিনি তার আওতাভুক্ত এলাকার নির্বাচন অনুষ্ঠান আইন ও বিধিমালা অনুসারে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যাবলি সম্পাদন করতে দায়িত্ববান থাকেন।
গণবিজ্ঞপ্তি জারি: নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সময়সূচি ঘোষণার পর, তিনি মনোনয়নপত্র বিতরণ, গ্রহণ, বাছাই এবং ভোটগ্রহণের স্থান ও সময় উল্লেখ করে তাঁর আওতাভুক্ত নির্বাচনি এলাকার জন্য পৃথক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন।
২. প্রার্থী বাছাই ও অনুমোদন:
মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাছাই: প্রার্থীদের দাখিলকৃত মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং তা যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) করার প্রধান দায়িত্ব তাঁর।
প্রার্থিতা বাতিল/অনুমোদন: তিনি যদি কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে ত্রুটি বা অসংগতি পান, তবে তিনি আইন অনুযায়ী সেই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারেন।
প্রতীক বরাদ্দ: মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দ দেন তিনি।
৩. ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ:
নিয়োগ: সহকারী রিটার্নিং অফিসারের সহায়তায় তিনি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ নিশ্চিত করেন।
প্রশিক্ষণ: ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব।
নিয়ন্ত্রণ: ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাগণ তাঁর (এবং নির্বাচন কমিশনের) নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং তাঁর যাবতীয় আইনানুগ আদেশ বা নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকেন।
৪. নির্বাচনী পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষা:
প্রচার প্রচারণা তদারকি: প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় সাধন করেন।
ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা: ভোটগ্রহণের দিন ভোটারদের লাইন ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা প্রদান করেন।
৫. ফল ঘোষণা:
ফলাফল একত্রীকরণ: প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে ভোট গণনা শেষে প্রাপ্ত ফলাফল গ্রহণ করেন।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা: সকল ভোটকেন্দ্রের ফলাফল একত্রিত করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি এলাকার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন এবং নির্বাচিত প্রার্থীর নাম নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করেন।
সংক্ষেপে, রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নির্বাচনি এলাকার নির্বাচনকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তাবলী সংশ্লিষ্ট আইনে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।




