সরকারি চাকরিতে বেতনের পাহাড়সম বৈষম্য: ক্ষোভে ফুঁসছেন ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা
দেশের সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে বিরাজমান চরম বৈষম্য নিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অভিযোগ, বর্তমান বেতন কাঠামোতে তাদের নাগরিক মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মানকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের মতে, গ্রেড যত উপরের দিকে যায়, বেতনের ব্যবধান তত অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা “দাস-মুনিব” প্রথার আধুনিক সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরিসংখ্যানের বৈষম্য: আকাশ-পাতাল তফাৎ
সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিম্নস্তরের কর্মচারীদের মধ্যে আর্থিক সুবিধার পার্থক্য এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
| গ্রেড পর্যায় | বেতনের ব্যবধান / পার্থক্য |
| ০১ থেকে ০৯ গ্রেড | ১,২৮,০০০/- টাকা |
| ১১ থেকে ২০ গ্রেড | ৫,০০০/- টাকা (কিছু ক্ষেত্রে ১০-২০ গ্রেডের ব্যবধান ১২,০০০/- টাকা) |
আগে ১১ ও ১০ম গ্রেডের মধ্যে বেতনের পার্থক্য ছিল ৩,৫০০ টাকা, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭,০০০ টাকায়। অর্থাৎ, আন্দোলনের সুফল বা সংস্কারের সুবিধা যখনই আসে, তার সিংহভাগ ভোগ করেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। অথচ মাঠ পর্যায়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের প্রাপ্তি থাকে নামমাত্র।
কর্মচারীদের দাবি ও বাস্তবতা
আন্দোলনরত কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, “আন্দোলন করে মরবে সাধারণ কর্মচারীরা, আর এসি রুমে বসে সুবিধা বেশি পাবেন কর্মকর্তারা—এটি চরম বৈষম্য। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের মোট পার্থক্য যেখানে মাত্র ১২ হাজার টাকা, সেখানে উপরের দিকের মাত্র কয়েকটি গ্রেডের পার্থক্য ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আমরা কি এই দেশের নাগরিক নই?”
বাজারদরের উর্ধ্বগতিতে যেখানে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে এই বিশাল ব্যবধান তাদের মনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। তারা মনে করছেন, এই ব্যবধান কেবল আর্থিক নয়, বরং এটি একটি মানসিক ও সামাজিক বিভাজন তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুষম বেতন কাঠামো হওয়া উচিত যেখানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে। ১ লাখ ২৮ হাজার টাকার এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ না হলে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড এবং কর্মস্পৃহা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাধারণ কর্মচারীরা এখন বৈষম্যমুক্ত একটি নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামোর দাবি তুলছেন, যেখানে গ্রেড বৈষম্য কমিয়ে মানবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা থাকবে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৫
| গ্রেড | বেতন স্কেল |
| ০১ | ১৬০০০০/- টাকা (নির্ধারিত) |
| ০২ | ১৩২০০০-১৫৩০০০ (টাকা) |
| ০৩ | ১১৩০০০-১৪৮৮০০ (টাকা) |
| ০৪ | ১০০০০০-১৪২৪০০ (টাকা) |
| ০৫ | ৮৬০০০-১৩৯৭০০ (টাকা) |
| ০৬ | ৭১০০০-১৩৪০০০ (টাকা) |
| ০৭ | ৫৮০০০-১২৬৮০০ (টাকা) |
| ০৮ | ৪৭২০০-১১৩৭০০ (টাকা) |
| ০৯ | ৪৫১০০-১০৮৮০০ (টাকা) |
| ১০ | ৩২০০০-৭৭৩০০ (টাকা) |
| ১১ | ২৫০০০-৬০৫০০ (টাকা) |
| ১২ | ২৪৩০০-৫৮৭০০ (টাকা) |
| ১৩ | ২৪০০০-৫৮০০০ (টাকা) |
| ১৪ | ২৩৫০০-৫৬৮০০ (টাকা) |
| ১৫ | ২২৮০০-৫৫২০০ (টাকা) |
| ১৬ | ২১৯০০-৫২৯০০ (টাকা) |
| ১৭ | ২১৪০০-৫১৯০০ (টাকা) |
| ১৮ | ২১০০০-৫০৯০০ (টাকা) |
| ১৯ | ২০৫০০-৪৯৬০০ (টাকা) |
| ২০ | ২০০০০-৪৮৪০০ (টাকা) |
১১-২০ গ্রেডের মধ্যে প্রতি গ্রেডে ব্যবধান এবং ১-৯ গ্রেডে প্রতি গ্রেডে ব্যবধান নিয়ে একটি বৈষম্য চিত্র

প্রস্তাবিত বেতন স্কেল-২০২৫ পর্যালোচনা করলে উচ্চতর গ্রেড (১-৯) এবং নিম্নতর গ্রেডগুলোর (১১-২০) মধ্যে বেতনের ব্যবধানে একটি বিশাল বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। নিচে এর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. উচ্চতর গ্রেড (১-৯) এর ব্যবধান বিশ্লেষণ:
এই স্তরে প্রতি গ্রেডের মধ্যে বেতনের পার্থক্য অত্যন্ত বেশি।
| গ্রেড পরিবর্তন | বেতনের ব্যবধান (টাকা) |
| ১ম থেকে ২য় | ২৮,০০০ |
| ২য় থেকে ৩য় | ১৯,০০০ |
| ৩য় থেকে ৪র্থ | ১৩,০০০ |
| ৪র্থ থেকে ৫ম | ১৪,০০০ |
| ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ | ১৫,০০০ |
| ৬ষ্ঠ থেকে ৭ম | ১৩,০০০ |
| ৭ম থেকে ৮ম | ১০,৮০০ |
| ৮ম থেকে ৯ম | ২,১০০ |
| মোট ব্যবধান (১-৯) | ১,১৪,৯০০ টাকা |
২. নিম্নতর গ্রেড (১১-২০) এর ব্যবধান বিশ্লেষণ:
এই স্তরে ১০টি গ্রেড থাকলেও প্রতি গ্রেডের মধ্যে বেতনের পার্থক্য খুবই সামান্য বা নামমাত্র।
| গ্রেড পরিবর্তন | বেতনের ব্যবধান (টাকা) |
| ১১তম থেকে ১২তম | ৭০০ |
| ১২তম থেকে ১৩তম | ৩০০ |
| ১৩তম থেকে ১৪তম | ৫০০ |
| ১৪তম থেকে ১৫তম | ৭০০ |
| ১৫তম থেকে ১৬তম | ৯০০ |
| ১৬তম থেকে ১৭তম | ৫০০ |
| ১৭তম থেকে ১৮তম | ৪০০ |
| ১৮তম থেকে ১৯তম | ৫০০ |
| ১৯তম থেকে ২০তম | ৫০০ |
| মোট ব্যবধান (১১-২০) | ৫,০০০ টাকা |
৩. বৈষম্য চিত্রের মূল পয়েন্টসমূহ:
১. টোটাল রেঞ্জ বৈষম্য: ১ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত মোট বেতনের পার্থক্য ১,১৪,৯০০ টাকা। অন্যদিকে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড—অর্থাৎ নিচের দিকের ১০টি গ্রেড মিলিয়ে মোট পার্থক্য মাত্র ৫,০০০ টাকা। অর্থাৎ উপরের দিকের ব্যবধান নিচের স্তরের তুলনায় প্রায় ২৩ গুণ বেশি।
২. একক ধাপের তুলনা: ১ম থেকে ২য় গ্রেডে উন্নীত হলে বেতন বাড়ে ২৮,০০০ টাকা। অথচ ১২তম থেকে ১৩তম গ্রেডের পার্থক্য মাত্র ৩০০ টাকা। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার একটি গ্রেড পরিবর্তনের সুবিধা, একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর প্রায় ৯৩টি ধাপ পরিবর্তনের সমান!
৩. গড় ব্যবধান: ১-৯ গ্রেডে প্রতি ধাপে গড় ব্যবধান প্রায় ১৪,৩৬০ টাকা। বিপরীতে ১১-২০ গ্রেডে প্রতি ধাপে গড় ব্যবধান মাত্র ৫৫৫ টাকা।
৪. জীবনযাত্রার মান: নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য গ্রেড পরিবর্তনের এই সামান্য ব্যবধান (৩০০-৯০০ টাকা) বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা এই বেতন কাঠামোতে একটি চরম বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
জানুয়ারির মধ্যেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি: বেতন বৈষম্য দূর করার আহ্বান



