সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

এনওসি বা জিও ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ ২০২৬ । অনুমতি ছাড়া বিদেশ যাত্রা সাময়িক স্বস্তি নাকি দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি?

সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি দাপ্তরিক শৃঙ্খলারও অংশ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেক সরকারি কর্মচারী জানতে চাইছেন—পাসপোর্টে পেশা ‘সরকারি কর্মচারী’ উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও অনাপত্তি পত্র (NOC) বা সরকারি আদেশ (GO) ছাড়া বিদেশ গেলে কোনো সমস্যা হবে কিনা। অনেকেই আবার ‘সহজ পথে’ ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু এই সাময়িক সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে আছে বড় ধরণের বিভাগীয় ও আইনি বিপদ।

অনুমতি ছাড়া বিদেশ যাওয়া কি বৈধ?

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা ছুটি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন না। সেখানে দেশের বাইরে যাওয়া মানে সরাসরি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা। আপনি যদি সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করেন এবং এনওসি ছাড়া ইমিগ্রেশন পার হয়েও যান, তবে সেটি আপনার অপরাধকে বৈধ করে না।

ইমিগ্রেশনে বিড়ম্বনার শঙ্কা

বর্তমানে ইমিগ্রেশন ডাটাবেজ অনেক বেশি আধুনিক। আপনার পাসপোর্টে যদি পেশা ‘সরকারি চাকুরি’ লেখা থাকে, তবে ইমিগ্রেশন পুলিশ আপনার কাছে এনওসি বা জিও দেখতে চাইতে পারে। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলে বিমানবন্দর থেকেই আপনাকে ফেরত পাঠানো হতে পারে, যা আপনার জন্য চরম লজ্জাজনক ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।

“অমুক তো গেছে, আমার কী হবে?”—এই ধারণা কতটা বিপজ্জনক?

অনেকে যুক্তি দেন যে, তাদের পরিচিত অনেকেই কোনো সমস্যা ছাড়াই বিদেশ ঘুরে এসেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নিয়ম ভাঙার দৃষ্টান্ত কখনও নিয়ম হতে পারে না। “চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন”—এই প্রবাদটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আপনি একবার বা দুবার পার পেয়ে গেলেও, বিষয়টি জানাজানি হলে আপনার ক্যারিয়ারে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি ও শাস্তি:

১. বিভাগীয় মামলা: অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি দপ্তরে জানাজানি হলে আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হতে পারে। ২. চাকুরিচ্যুতি বা পদাবনতি: ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য করে আপনাকে সাময়িক বরখাস্ত, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এমনকি চাকুরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হতে পারে। ৩. পেনশন ও সুবিধায় বাধা: অবসরের সময় বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই অননুমোদিত বিদেশ ভ্রমণ আপনার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ৪. ভবিষ্যৎ জটিলতা: পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেলে বা সরকারি কোনো সুবিধা নিতে গেলে আপনার পূর্বের রেকর্ড আপনার বিপক্ষে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, ব্যক্তিগত কারণে হোক বা ভ্রমণে, বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছুটি ও এনওসি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে একদিকে যেমন মানসিক প্রশান্তি থাকে, অন্যদিকে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। শর্টকাট রাস্তা বেছে নিয়ে নিজের তিলে তিলে গড়া ক্যারিয়ারকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পরিশেষে, শৃঙ্খলাই একজন সরকারি কর্মচারীর মূল পরিচয়। তাই আইন মেনে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা উচিত।

সরকারি কর্মচারী বিনা অনুমতিতে বিদেশ ভ্রমণ করলে কি শাস্তি হতে পারে?

একজন সরকারি কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি (NOC) বা ছুটি (GO) ব্যতিরেকে বিদেশ ভ্রমণ করলে তাকে গুরুতর দাপ্তরিক ও আইনি শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এই বিষয়টিকে “অসদাচরণ” (Misconduct) এবং “কর্তব্যে অবহেলা” হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিনা অনুমতিতে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের শাস্তিগুলো হতে পারে:

১. বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত

অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে বিদেশে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে বিধিমালার ৪ ধারা অনুযায়ী দুই ধরণের শাস্তি দেওয়া হয়:

ক) লঘু দণ্ড (Minor Penalties):

  • তিরস্কার: লিখিতভাবে সতর্ক করা।

  • পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত: নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি বা ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা।

  • আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়: সরকারি কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তা বেতন থেকে কেটে নেওয়া।

খ) গুরু দণ্ড (Major Penalties):

  • নিম্ন পদে বা নিম্ন বেতন স্কেলে অবনমিতকরণ (Demotion): পদমর্যাদা কমিয়ে দেওয়া।

  • বাধ্যতামূলক অবসর: বয়স হওয়ার আগেই চাকুরি থেকে সরিয়ে দেওয়া।

  • চাকুরি হতে অপসারণ: চাকুরি চলে যাওয়া, তবে ভবিষ্যতে অন্য চাকুরিতে যোগদানের যোগ্যতা থাকতে পারে।

  • চাকুরি হতে বরখাস্ত: এটি সবচেয়ে কঠোর শাস্তি। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকারি চাকুরিতে যোগদানের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

২. বেতন ও ছুটি সংক্রান্ত জটিলতা

  • অনুমতি ছাড়া বিদেশে থাকা কালীন সময়কে “অনুপস্থিতি” হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ওই সময়ের কোনো বেতন বা ভাতা প্রদান করা হয় না।

  • এটি চাকুরির ধারাবাহিকতায় ছেদ (Break in Service) হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা আপনার পেনশন ও গ্র্যাচুইটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

৩. ইমিগ্রেশন ও আইনি বাধা

  • পাসপোর্টে পেশা ‘সরকারি কর্মচারী’ উল্লেখ থাকলে ইমিগ্রেশন পুলিশ NOC দেখতে চাইতে পারে। দেখাতে না পারলে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয় এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়।

  • পেশা লুকিয়ে (যেমন: ‘Private Service’ লিখে) পাসপোর্ট করে বিদেশ গেলেও পরে ধরা পড়লে জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের দায়ে ফৌজদারি মামলার ঝুঁকি থাকে।

৪. পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ সুবিধা বঞ্চিত হওয়া

আপনার এসিআর (ACR) বা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে এই শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়টি রেকর্ড করা হয়। ফলে ভবিষ্যতে আপনার পদোন্নতি আটকে যেতে পারে এবং উচ্চতর স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সারকথা: “চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন”—এই নীতিতে হয়তো একবার বা দুবার পার পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হলে আপনার সারা জীবনের কষ্টার্জিত ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই সবসময় যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে ছুটি ও NOC নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করা নিরাপদ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *