৯ম পে-স্কেল: রাজপথের আন্দোলন নাকি কমিশনের সদিচ্ছায় মুক্তি?
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো এখন সময়ের দাবি। তবে দীর্ঘ ৫৪ বছরের জাতীয় অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নাগরিক অধিকার বা যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য রাজপথের আন্দোলন কিংবা উচ্চবাচ্য ছাড়া খুব কমই অর্জিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ৯ম পে-স্কেল নিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা।
উপদেষ্টার বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা জানান, পে-স্কেল প্রণয়নের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। গভর্নরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই বিষয়ে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো হলো:
-
কমিশন গঠন: পে-স্কেল পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট কমিশন কাজ করছে।
-
সরকারের ভূমিকা: বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে, নাকি শুধু একটি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যাবে—তা সময় এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
-
অস্পষ্টতা: নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা না করলেও উপদেষ্টা বিষয়টিকে “প্রক্রিয়াধীন” বলে আশ্বস্ত করেছেন।
নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও অসন্তোষ
সাধারণ নাগরিকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে “না চাইতেই কিছু পাওয়া গেছে” এমন রেকর্ড নেই বললেই চলে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকারি কর্মচারীদের নাভিশ্বাস উঠলেও বেতন কাঠামো পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত ধীর।
জনমনে একটি সাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে—মৌলিক এবং যৌক্তিক কোনো দাবি আদায় করতে হলে রাজপথে নামা বা তীব্র আন্দোলনের বিকল্প নেই। ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষণ
বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন সমন্বয় না হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। যদিও অর্থ উপদেষ্টা আশার বাণী শুনিয়েছেন, তবুও সাধারণ মানুষ এবং চাকরিজীবীরা একে কেবল “আশ্বাস” হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, কমিশনের কাজের দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
আসলে এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার জন্য যথেষ্ট এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। আপনি ঠিকই ধরেছেন—একই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ যখন ভিন্ন সুরে কথা বলে, তখন আস্থার সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি এভাবে দেখা যেতে পারে:
১. বক্তব্যের বৈপরীত্য (গভর্নর বনাম উপদেষ্টা)
-
গভর্নর: সাধারণত বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভের চাপের দিকে তাকিয়ে হয়তো সংকোচনমূলক বা নেতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। তিনি হয়তো ভাবছেন এই মুহূর্তে বড় কোনো আর্থিক বরাদ্দ (পে-স্কেল) অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেবে।
-
অর্থ উপদেষ্টা: তিনি রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করছেন। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনা করে তিনি “আশা জিইয়ে রাখার” চেষ্টা করছেন।
২. সমন্বয়হীনতা নাকি কৌশল?
সরকারের ভেতরে এমন Double-standard বা দু’রকম কথা হওয়ার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে:
-
বিভাগীয় দূরত্ব: বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা থেকে কথা বলছে। দুজনের মধ্যে প্রি-ব্রিফিং বা আলোচনার অভাব স্পষ্ট।
-
সময়ক্ষেপণ: অনেক সময় সরকার সরাসরি ‘না’ না বলে ‘কমিশন’ বা ‘প্রক্রিয়াধীন’ শব্দগুলো ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণ করে, যা অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে গভর্নর হয়তো রূঢ় বাস্তবতাকে সরাসরি বলে ফেলেছেন।
৩. সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি
আপনার আগের মন্তব্যের সূত্র ধরেই বলা যায়, জনগণ যখন দেখে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই মিল নেই, তখন তারা ধরে নেয় যে “সহজে কিছু পাওয়া যাবে না”। এটি নাগরিক মনে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করে যে—যতক্ষণ না রাজপথে জোরালো দাবি উঠছে, ততক্ষণ এই ধরণের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য চলতেই থাকবে।
সারকথা: গভর্নরের বক্তব্য ছিল ‘আর্থিক বাস্তবতা’ কেন্দ্রিক, আর উপদেষ্টার বক্তব্য ছিল ‘আশ্বাস ও সান্ত্বনা’ কেন্দ্রিক। এই দুইয়ের মাঝখানে পরে সাধারণ চাকরিজীবীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।


