বিটিভিতে তারেক রহমানের ভাষণ: ক্ষমতায় গেলে সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন পে স্কেল ও ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষণা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে ‘জাতীয় পে স্কেল’ বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ নির্বাচনী ভাষণে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে এই ভাষণ সম্প্রচারিত হয়।
প্রশাসনে মেধার মূল্যায়ন ও পে স্কেল
তারেক রহমান তার বক্তব্যে প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতিরোধে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “প্রশাসন পরিচালনায় বিএনপি মেধাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবে। নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি হবে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যাতে সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারেন, সেজন্য আমরা সঠিক সময়ে নতুন পে স্কেল ঘোষণা ও তা বাস্তবায়ন করব।”
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’
আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি জানান:
প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোকে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে।
প্রতিটি কার্ডধারী পরিবারকে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।
পর্যায়ক্রমে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
কৃষক কার্ড ও কৃষি খাতের উন্নয়ন
কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এই কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষিবিমা সুবিধা প্রদান করা হবে। এ ছাড়া মৎস্যচাষি ও পশুপালনকারী খামারিরাও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় থাকবেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ (সুদসহ) মওকুফের পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখা
ভাষণে তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “প্রতিটি সেক্টর ও প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য এমন এক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যেখানে জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, বিদেশে বছরে ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের মাধ্যমে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশবাসীকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
২০ কোটি টাকা বরাদ্দের টাকা দিয়ে কি ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন হবে?
২০ কোটি টাকা দিয়ে একটি দেশের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো বিশাল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গাণিতিকভাবে এবং বাস্তবিকভাবে সম্ভব নয়।
কেন এটি সম্ভব নয়, তা নিচের সাধারণ হিসাব এবং তথ্যের বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে:
১. ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার হিসাব
তারেক রহমান তার বক্তব্যে জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ডে প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা দেওয়া হবে।
যদি মাত্র ১ লাখ দরিদ্র পরিবারকেও এই সুবিধা দেওয়া হয়, তবে প্রতি মাসে খরচ হবে: $১,০০,০০০ \times ২,৫০০ = ২৫,০০,০০,০০০$ (২৫ কোটি) টাকা।
অর্থাৎ, ১ লাখ পরিবারের জন্য মাত্র এক মাসের খরচই হবে ২৫ কোটি টাকা, যা আপনার উল্লিখিত ২০ কোটি টাকার বাজেটের চেয়ে বেশি।
বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি প্রথম পর্যায়ে ৫০ লাখ বা তার বেশি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়, তবে বার্ষিক খরচ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
২. কৃষক কার্ডের খরচ
দেশের কৃষকের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে। তাদের জন্য সার, বীজ এবং কীটনাশকে ভর্তুকি দিতে হলে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। শুধু কার্ড ছাপানোর খরচই কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
৩. বাজেটের প্রকৃত প্রেক্ষাপট
আপনি যে ২০ কোটি টাকার কথা বলছেন, সেটি হয়তো কোনো একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী সভা, প্রচারণা বা ক্ষুদ্র কোনো পাইলট প্রকল্পের (নমুনা প্রকল্প) বরাদ্দের তথ্য হতে পারে। জাতীয় পর্যায়ের ইশতেহার বাস্তবায়নে যে বাজেট প্রয়োজন হয়, তা সাধারণত রাজস্ব বাজেট এবং উন্নয়ন বাজেট থেকে আসে।
বাস্তব চিত্র কী হতে পারে?
বিএনপি বা যেকোনো রাজনৈতিক দল যখন এ ধরনের বড় প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু উৎসের কথা বলে:
দুর্নীতি দমন: তারেক রহমান তার ভাষণে দুর্নীতি দমনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের দাবি, পাচার হওয়া টাকা ফেরত এবং সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধ করে বিপুল অর্থ সাশ্রয় করা হবে।
বাজেট পুনর্গঠন: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) অনুৎপাদনশীল খাত থেকে টাকা সরিয়ে এসব সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া।
জিডিপি বৃদ্ধি: অর্থনীতির আকার বাড়িয়ে (১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা) কর আদায় বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অর্থ সংস্থান করা।
সারসংক্ষেপ: ২০ কোটি টাকা দিয়ে কোটি মানুষের জন্য ফ্যামিলি বা কৃষক কার্ড বিতরণ ও পরিচালনা করা অসম্ভব। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বাৎসরিক বাজেটের প্রয়োজন হবে।



