২০২৬ সালের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় বড় বৈষম্য: মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের ছুটি কমল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বেশি
সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৬ সালের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় ধরণের অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা গেছে। প্রকাশিত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, কলেজ ও মাদ্রাসার তুলনায় মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছুটি উপভোগ করবেন।
ছুটির তথ্যাদি বিশ্লেষণ: শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত ২০২৬ সালের ছুটির তালিকা অনুযায়ী:
-
কলেজ: ২০২৬ সালে কলেজসমূহে মোট ছুটি বরাদ্দ করা হয়েছে ৭২ দিন (সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার ছাড়া)।
-
মাদ্রাসা: মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী মাদ্রাসায় ছুটি থাকবে ৭০ দিন (সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া)।
-
মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলোতে বাৎসরিক ছুটি ধরা হয়েছে ৬৪ দিন। তবে এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্র ও শনিবার) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের প্রকৃত ছুটি দাঁড়ায় মাত্র ৫৬ দিন।
২০২৫ সালের সাথে তুলনা: বিগত বছরের (২০২৫) ছুটির তালিকার সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর ছুটি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
-
২০২৫ সালে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছুটি ছিল ৭৬ দিন।
-
মাদ্রাসায় ছুটি ছিল ৭৩ দিন।
-
তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রাথমিক ও কলেজেও ছুটির পরিমাণ যথাক্রমে ৭৬ দিন ও ৭১ দিন ছিল।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের ছুটি ২০ দিন কমে ৫৬ দিনে নেমে এসেছে, যেখানে কলেজ ও মাদ্রাসার ছুটি ৭০-এর কোঠায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
বৈষম্যের চিত্র: পরিসংখ্যানটি নিচে তুলে ধরা হলো:
-
কলেজ (২০২৬): ৭২ দিন
-
মাদ্রাসা (২০২৬): ৭০ দিন
-
মাধ্যমিক (২০২৬): ৫৬ দিন (১৬ দিন কম কলেজের তুলনায়)
-
প্রাথমিক (২০২৬): ৫৬ দিন (১৬ দিন কম কলেজের তুলনায়)
জনদাবি: একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ছুটির এই বিশাল ব্যবধান শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈষম্য দূর করে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সমন্বিত ও অভিন্ন ছুটির তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য।

সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা ২০২৬
কলেজ মাদ্রাসার ছুটি বেশি দিন কেন?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাধারণ কাঠামো এবং প্রচলিত নিয়ম বিশ্লেষণ করলে কলেজ ও মাদ্রাসার ছুটি বেশি হওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ ধারণা করা যায়:
১. পবিত্র রমজান মাসের ছুটি (প্রধান কারণ): মাদ্রাসা ও কলেজের ছুটির সাথে স্কুলের ছুটির বড় পার্থক্য তৈরি হয় সাধারণত রমজান মাসের ছুটিকে কেন্দ্র করে।
-
মাদ্রাসা: ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মাদ্রাসায় সাধারণত পবিত্র রমজান মাসের শুরু থেকেই পুরো মাস এবং ঈদের পরবর্তী কিছু দিন পর্যন্ত একটানা লম্বা ছুটি থাকে।
-
স্কুল (মাধ্যমিক ও প্রাথমিক): সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ এবং নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য রমজান মাসেও কিছুদিন ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রাথমিকে রমজানের ছুটি মাত্র ১৯ দিন (৮ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ), যা মাদ্রাসার তুলনায় অনেক কম।
২. পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র: কলেজগুলোতে সাধারণত এইচএসসি, ডিগ্রি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার কেন্দ্র পড়ে। এসব পরীক্ষার সময় দীর্ঘ দিন কলেজের নিয়মিত ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও ছুটির ধরণ স্কুলের চেয়ে ভিন্ন হয়। তবে ঘোষিত ছুটিতে এর প্রতিফলন সব সময় থাকে না, বরং “পরীক্ষাজনিত ছুটি” আলাদাভাবে গণ্য হয়।
৩. নতুন কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি (স্কুল): প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে নতুন কারিকুলাম চালু রয়েছে। এই পদ্ধতিতে “শিখনকালীন মূল্যায়ন” (Continuous Assessment) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং সিলেবাস শেষ করার চাপ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কর্মঘণ্টা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ২০২৬ সালে স্কুলের ছুটি কমিয়ে ৫৬ দিন করা হয়েছে।
৪. প্রশাসনিক ভিন্নতা:
-
প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে “প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়”।
-
মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ নিয়ন্ত্রণ করে “শিক্ষা মন্ত্রণালয় (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ)”।
-
মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করে “কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ”। ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর তাদের নিজস্ব নীতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা ছুটির তালিকা প্রস্তুত করে, যার ফলে এই অসামঞ্জস্য দেখা দেয়।
সারসংক্ষেপ: মূলত রমজান মাসের ছুটির দৈর্ঘ্য এবং নতুন কারিকুলামের ক্লাসের চাপ—এই দুটি কারণেই মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের ছুটি ২০২৬ সালে কলেজ ও মাদ্রাসার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে ধারণা করা যায়।


