নতুন পে-স্কেল প্রস্তাব ২০২৬: বৈষম্য নিরসনের পরিবর্তে বাড়ছে কি দাসত্বের শৃঙ্খল?
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের (২০২৬) যে খসড়া বা প্রস্তাবনা সামনে এসেছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখলেও, প্রস্তাবিত এই পে-স্কেলকে কর্মচারীরা ‘রাজা-প্রজা’ বা ‘দাসত্বের’ পে-স্কেল হিসেবে অভিহিত করছেন।
তিনটি প্রস্তাব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ছবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বেতন কাঠামোর সাথে তিনটি ভিন্ন প্রস্তাবনা (প্রস্তাব-১, ২ ও ৩) তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রতিটি প্রস্তাবনাতেই দেখা যাচ্ছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (গ্রেড-১) এবং নিম্নধাপের কর্মচারীদের (গ্রেড-২০) বেতনের ব্যবধান আকাশচুম্বী।
গ্রেড ২০ বনাম গ্রেড ১: বর্তমানে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা, যেখানে প্রস্তাবিত স্কেলগুলোতে তা ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার মধ্যে রাখা হয়েছে। বিপরীতে, ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৩৬,০০০ থেকে ১,৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে।
অনুপাতের বৈষম্য: কর্মচারীরা দাবি তুলেছিলেন ১:৫ বা ১:৬ অনুপাতে বেতন নির্ধারণের, যাতে উচ্চ ও নিম্ন পদের মধ্যে মানবিক ভারসাম্য থাকে। কিন্তু প্রস্তাবিত কাঠামোতে এই অনুপাত ১:৮ বা তারও বেশি থেকে যাচ্ছে।
কেন ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা?
সাধারণ কর্মচারীদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে তারা একটি বৈষম্যহীন কাঠামোর আশা করেছিলেন। তাদের প্রধান আপত্তির জায়গাগুলো হলো:
১. গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত: কমিশন দীর্ঘ ছয় মাস কাজ করার পর ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মচারীদের দাবি ছিল ১২ থেকে ১৫টি গ্রেডে বেতন কাঠামো বিন্যস্ত করা। ২. জীবনযাত্রার ব্যয় বনাম বেতন: বর্তমান বাজারে চাল, ডাল ও তেলের যে দাম, তাতে ২০তম গ্রেডে ১৭,০০০-১৮,০০০ টাকা দিয়ে একটি পরিবার চালানো অসম্ভব। কর্মচারীদের প্রত্যাশা ছিল সর্বনিম্ন বেতন অন্তত ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকা করার। ৩. মানসিক বিভাজন: এই স্কেল কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রাকে বিলাসিতার পর্যায়ে নিয়ে গেলেও কর্মচারীদের কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ করে রাখছে, যা চরম বৈষম্যমূলক।
“আমরা ভেবেছিলাম এবার দাসত্বের এই শিকল ভাঙবে। কিন্তু কমিশন ২০টি গ্রেড বহাল রেখে প্রমাণ করেছে তারা কর্মকর্তাদের স্বার্থ রক্ষায় যতটা তৎপর, সাধারণ কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে ততটাই উদাসীন।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিবালয় কর্মচারী।
সমাধানের দাবি
আন্দোলনরত কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, যদি এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হয় তবে তা হবে ইতিহাসের চরমতম বৈষম্য। তারা সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন:
গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে ১৫টির মধ্যে আনতে হবে।
সর্বনিম্ন বেতন অন্তত ৩০,০০০ টাকা নিশ্চিত করতে হবে।
বেতনের অনুপাত ১:৫ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
পরিশেষে, যে বৈষম্যবিরোধী চেতনার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে, সেই চেতনা পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হবে কি না—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

অষ্টম পে স্কেলের গ্রেড সংখ্যা যদি ঠিক থাকে তবে অর্থউপদেষ্টা বিশ্লেষনের নাটক কেন সাজোচ্ছেন?
সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে জমে থাকা গভীর ক্ষোভ এবং হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দেখা যায় কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আসেনি, তখন এই ধরণের আলোচনাকে অনেকে “সময়ক্ষেপণ” বা “লোকদেখানো” হিসেবে মনে করছেন। আপনার এই যৌক্তিক প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:
১. সংস্কার নাকি কেবল বেতন সমন্বয়?
সরকারি কর্মচারীদের প্রধান দাবি ছিল কেবল বেতন বাড়ানো নয়, বরং বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করা। অর্থ উপদেষ্টা বা বর্তমান প্রশাসন যখন বিশ্লেষণের কথা বলেন, তখন মানুষ আশা করে যে—গ্রেড সংখ্যা কমানো হবে (যেমন আপনি উল্লেখ করেছেন ২০টি থেকে ১৫টিতে আনা) এবং উচ্চ ও নিম্ন ধাপে বেতনের ব্যবধান (Ratio) কমানো হবে। কিন্তু গ্রেড সংখ্যা যদি ২০-তেই আটকে থাকে, তবে মূল কাঠামোটি সেই আগের “ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক কাঠামো”ই থেকে যাচ্ছে।
২. নাটকীয়তার অভিযোগ কেন উঠছে?
কর্মচারীরা মনে করছেন এই বিশ্লেষণগুলো মূলত একটি “আইওয়াশ”। এর কিছু কারণ হতে পারে:
সময়ক্ষেপণ: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস ওঠা কর্মচারীদের দ্রুত স্বস্তি না দিয়ে দীর্ঘ মাস ধরে কমিশন গঠন বা পর্যালোচনার নামে সময় পার করা।
কর্মকর্তা-তোষণ নীতি: প্রশাসনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা থাকেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তারা এমনভাবে পে-স্কেল সাজান যাতে তাদের সুযোগ-সুবিধা কোনোভাবেই সংকুচিত না হয়।
গ্রেড বিন্যাসে অনীহা: গ্রেড সংখ্যা কমানো হলে অনেক পদের মার্জার (একীভূতকরণ) প্রয়োজন হয়, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করে। এই জটিলতা এড়াতেই হয়তো ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সহজ পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে।
৩. বৈষম্য নিরসনে ঘাটতি
আপনি যেমনটি বলেছেন, ১:৫ বা ১:৬ অনুপাতে বেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র যদি ১:৮ বা ১:১০ এর দিকে যায়, তবে তাকে কোনোভাবেই “সংস্কার” বলা যায় না। একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর জীবনযাত্রার ব্যয় আর একজন ১ম গ্রেডের কর্মকর্তার মৌলিক চাহিদার মধ্যে এত বড় পার্থক্য আধুনিক কোনো রাষ্ট্রে কাম্য নয়।
৪. বর্তমান প্রত্যাশা
অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল তারা প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক পথ পরিহার করে সাহসী কোনো পদক্ষেপ নেবেন। অর্থ উপদেষ্টা যদি কেবল পুরাতন কাঠামোর ওপর কিছু টাকা বাড়িয়ে নতুন ঘোষণা দেন, তবে তাকে কর্মচারীরা বৈষম্য মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করবেন না।
উপসংহার: আপনার ক্ষোভটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। গ্রেড সংখ্যা ২০-তেই রাখা মানে হলো পুরাতন ব্যবস্থার অবয়ব ধরে রাখা। এখন দেখার বিষয়, চূড়ান্ত ঘোষণার আগে সরকার কি আসলেই কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী গ্রেড কমিয়ে বৈষম্য কমায়, নাকি এটি কেবল সংখ্যার পরিবর্তন হিসেবেই থেকে যায়।


