বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন: সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম ও আইনি বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার বা ‘ফারায়েজ’ আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন একটি সুনির্দিষ্ট ও ধর্মীয় বিধানসম্মত প্রক্রিয়া। সম্প্রতি উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে শৃঙ্খলা আনতে সরকারের পক্ষ থেকে ‘বণ্টননামা দলিল’ রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুসলিম আইনে সম্পত্তি বণ্টনের প্রধান ভিত্তি এবং এর বর্তমান আইনি প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।
উত্তরাধিকারীর তিন শ্রেণি
মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারীদের মূলত তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. অংশীদারগণ (Sharers): পবিত্র কোরআনে নির্ধারিত ১২ জন সদস্য (৪ জন পুরুষ ও ৮ জন মহিলা) এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সম্পত্তি বণ্টনের শুরুতে তাঁদের নির্ধারিত অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যেমন:
স্বামী: সন্তান থাকলে ১/৪ এবং না থাকলে ১/২ অংশ পান।
স্ত্রী: সন্তান থাকলে ১/৮ এবং না থাকলে ১/৪ অংশ পান।
কন্যা: একজন হলে ১/২ এবং একাধিক হলে ২/৩ অংশ পান। তবে ভাই থাকলে ২:১ অনুপাতে বণ্টন হয়।
২. অবশিষ্টাংশ ভোগীগণ (Residuaries): অংশীদারদের বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি এই শ্রেণির নিকটাত্মীয়রা পান। পুত্র-কন্যার ক্ষেত্রে পুত্ররা কন্যার দ্বিগুণ হারে এই অংশ লাভ করেন।
৩. দূর সম্পর্কের আত্মীয়গণ: যদি উপরের দুই শ্রেণির কেউ জীবিত না থাকেন, তবেই কেবল তাঁরা সম্পত্তির অধিকার পান।
সম্পত্তি বণ্টনের আবশ্যিক ধাপসমূহ
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ ভাগ করার আগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক:
মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ মেটানো।
মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা।
কোনো বৈধ ‘উইল’ বা ওসিয়ত থাকলে তা কার্যকর করা (যা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না)।
নতুন নিয়ম: বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক
বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি শুধু মৌখিকভাবে বা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেই আইনি পূর্ণতা পায় না। আইন অনুযায়ী এখন বণ্টননামা দলিল (Partition Deed) রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। এই দলিল ছাড়া কোনো ওয়ারিশ তাঁর প্রাপ্ত অংশ নিজের নামে নামজারি (Mutation) করতে পারবেন না এবং জমিও বিক্রি করতে পারবেন না। এই নিয়মটি উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জালিয়াতি এবং পারিবারিক বিবাদ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
উত্তরাধিকার আইন প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তাই সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়াতে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী বা ফারায়েজ বিশারদদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

একমাত্র কন্যা সন্তান মায়ের সম্পদের কত অংশ পাবে?
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) অনুযায়ী, মৃত মায়ের সম্পত্তিতে একমাত্র কন্যা কতটুকু অংশ পাবেন তা নির্ভর করে ওই মৃত ব্যক্তির আরও কোন কোন ওয়ারিশ (যেমন: স্বামী বা বাবা-মা) বেঁচে আছেন তার ওপর।
তবে শুধুমাত্র কন্যার অংশ বিবেচনা করলে নিয়মটি নিম্নরূপ:
১. যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে
মৃত ব্যক্তির যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে এবং কেবল একটি মাত্র কন্যা থাকে, তবে সেই কন্যা মায়ের মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) সরাসরি পাবেন।
২. যদি পুত্র সন্তান থাকে
যদি মৃত ব্যক্তির এক বা একাধিক পুত্র সন্তান থাকে, তবে কন্যা আর নির্দিষ্ট অংশের (১/২) অধিকারী হন না। এক্ষেত্রে তিনি ‘আসাবা’ বা অবশিষ্টাংশ ভোগী হিসেবে গণ্য হন। তখন নিয়ম হলো:
পুত্র এবং কন্যা ২:১ অনুপাতে সম্পদ পাবেন। অর্থাৎ, ভাই যা পাবেন, বোন তার অর্ধেক পাবেন।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক:
ধরা যাক, একজন মা মারা গেছেন এবং তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে কেবল স্বামী এবং একজন কন্যা আছেন।
স্বামী পাবেন: ১/৪ অংশ (সন্তান থাকায়)।
কন্যা পাবেন: ১/২ অংশ (প্রধান অংশীদার হিসেবে)।
বাকি ১/৪ অংশ পুনরায় কন্যা এবং স্বামীর মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে (যাকে আইনের ভাষায় ‘রদ’ বা ফেরত আসা বলা হয়)। ফলে কোনো পুত্র না থাকলে কার্যত কন্যার অংশ অনেক বেড়ে যায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি মৃত মায়ের স্বামী, মাতা বা পিতা বেঁচে থাকেন, তবে আগে তাঁদের নির্দিষ্ট অংশ বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর বাকি সম্পত্তির হিসাব করতে হয়।



