দীর্ঘমেয়াদী অর্জিত ছুটিতে থাকলেও এসিআর (ACR) বাধ্যতামূলক: অনুশাসনমালার ভুল ব্যাখ্যায় ভোগান্তি
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী অর্জিত ছুটিতে (Earned Leave) থাকাকালীন গোপনীয় অনুবেদন প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা। তবে ‘গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা, ২০২০’ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘকাল অর্জিত ছুটিতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গোপনীয় অনুবেদন দাখিল ও গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
বিধিমালা কী বলছে?
অনুশাসনমালার ৩.৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সব ক্ষেত্রেই গোপনীয় অনুবেদন প্রযোজ্য। উক্ত অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে গোপনীয় অনুবেদন প্রযোজ্য হবে না:
বুনিয়াদি ও বিভাগীয় প্রশিক্ষণকাল।
বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OSD) থাকাকালীন সময়।
বাধ্যতামূলক অপেক্ষমাণ কাল।
পদায়নের জন্য ন্যস্তকাল।
লিয়েন (Lien) ও সাময়িক বরখাস্তকাল।
শিক্ষা ছুটি (দেশে বা বিদেশে)।
মাতৃত্বজনিত ছুটি এবং অসাধারণ ছুটি (Extraordinary Leave)।
অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা গেছে, একজন সরকারি কর্মচারী ১০ মাস চিকিৎসাজনিত অর্জিত ছুটিতে থাকায় তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে গোপনীয় অনুবেদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অথচ নীতিমালায় ‘অর্জিত ছুটি’ বা ‘চিকিৎসাজনিত ছুটি’কে অব্যাহতিপ্রাপ্ত তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ, কেউ যদি ৪ মাস, ৬ মাস বা ১০ মাসও অর্জিত ছুটিতে থাকেন, তবে সেই সময়ের জন্য তাঁর গোপনীয় অনুবেদন অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআর একজন সরকারি কর্মচারীর পদোন্নতি, সিলেকশন গ্রেড এবং অন্যান্য বিভাগীয় সুবিধার জন্য অপরিহার্য দলিল। বিধিমালায় উল্লিখিত নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে (যেমন: দীর্ঘমেয়াদী অর্জিত ছুটি) এসিআর না দেওয়া স্পষ্টত নিয়ম পরিপন্থী। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
করণীয়
অনুশাসনমালা অনুযায়ী, যদি কেউ অর্জিত ছুটিতে থাকেন, তবে সেই সময়ের জন্য তাঁর এসিআর ফর্মে তথ্য পূরণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করতে হবে। প্রতিবেদি (Reporting Officer) এবং প্রতিস্বাক্ষরকারী (Counter-signing Officer) কর্মকর্তাদেরও উচিত বিধিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করে অনুবেদন সম্পন্ন করা, যাতে কোনো কর্মচারী তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।

কাদের জন্য এসিআর প্রযোজ্য নয়?
আপনার আপলোড করা ছবি এবং ‘গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা, ২০২০’ এর নির্দেশনা ৩.৭ অনুযায়ী, যাদের ক্ষেত্রে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (ACR) প্রযোজ্য হবে না বা প্রয়োজন নেই, তাঁদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
গোপনীয় অনুবেদন (ACR) যে সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়:
১. প্রশিক্ষণকাল: বুনিয়াদি (Foundation) এবং বিভাগীয় প্রশিক্ষণকালীন সময়ের জন্য। ২. ওএসডি (OSD) কাল: বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত থাকাকালীন সময়। ৩. অপেক্ষমাণ কাল: বাধ্যতামূলক অপেক্ষমাণ কাল (Compulsory Wait for Posting)। ৪. ন্যস্তকাল: পদায়নের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরে ন্যস্ত থাকাকালীন সময়। ৫. লিয়েন (Lien): বৈদেশিক বা অন্য চাকরিতে লিয়েনে থাকাকালীন সময়। ৬. সাময়িক বরখাস্তকাল: যদি কোনো কর্মচারী সাময়িকভাবে বরখাস্ত (Suspended) থাকেন। ৭. শিক্ষা ছুটি: দেশের অভ্যন্তরে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটিতে থাকাকালীন সময়। ৮. প্রেষণে প্রশিক্ষণ/অধ্যয়ন: দেশের ভেতরে বা বিদেশে প্রেষণে (Deputation) প্রশিক্ষণ বা অধ্যয়নকাল। ৯. মাতৃত্বজনিত ছুটি: নারী কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়। ১০. অসাধারণ ছুটি: বিধি মোতাবেক নেওয়া অসাধারণ ছুটি (Extraordinary Leave)।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
অর্জিত ছুটি (Earned Leave): আপনার মূল প্রশ্নের সূত্র ধরে স্পষ্ট করা ভালো যে, অর্জিত ছুটি বা চিকিৎসাজনিত ছুটি এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ, অর্জিত ছুটিতে থাকলেও এসিআর প্রযোজ্য হবে।
অবহিতকরণ: উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোর কারণে যাদের এসিআর প্রযোজ্য হবে না, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিতভাবে (অফিস আদেশের কপিসহ) ডোসিয়ার সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং পিডিএস (PDS) হালনাগাদ করতে হবে।



