বুধবার ও বৃহস্পতিবার নৈমিত্তিক ছুটি নিলে শুক্রবারও কি ছুটি হিসেবে গণনা হবে? যা বলছে সরকারি চাকরির ছুটির বিধান
সরকারি চাকরিজীবীদের নৈমিত্তিক ছুটি বা ক্যাজুয়াল লিভ (Casual Leave-CL) নিয়ে প্রায়ই দপ্তরভেদে ভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে নৈমিত্তিক ছুটির আগে বা পরে সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা সরকারি ছুটি থাকলে সেই বন্ধের দিন নৈমিত্তিক ছুটির হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না—এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। একজন সরকারি কর্মচারী বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনের নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করেন। শুক্রবার তার কর্মস্থলে সাপ্তাহিক ছুটি এবং শনিবার তিনি যথারীতি অফিসে যোগ দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অফিস কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, বুধবার ও বৃহস্পতিবারের সঙ্গে শুক্রবারও যুক্ত হবে এবং মোট তিন দিন নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে গণনা করা হবে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরির প্রচলিত ছুটি বিধান অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক?
নৈমিত্তিক ছুটি অর্জিত ছুটির মতো নিয়মিত ছুটি নয়
সরকারি চাকরিতে নৈমিত্তিক ছুটি সাধারণত স্বল্প সময়ের ব্যক্তিগত প্রয়োজন, জরুরি কাজ বা আকস্মিক কারণে মঞ্জুর করা হয়। এটি অর্জিত ছুটি, অর্ধগড় বেতনের ছুটি বা অন্যান্য নিয়মিত ছুটির মতো কর্মচারীর ছুটি হিসাবের স্থায়ী জমার অংশ নয়।
নৈমিত্তিক ছুটি কোনো কর্মচারীর অধিকার হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্মপরিস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করে এ ছুটি মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তবে ছুটি মঞ্জুর হওয়ার পর কত দিন নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে গণনা হবে, সেটি প্রচলিত সরকারি আদেশ, নির্দেশনা এবং ছুটি ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুসারে নির্ধারণ করতে হয়।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে শনিবার অফিস করলে শুক্রবার কি CL হিসেবে কাটবে?
আলোচিত ঘটনায় কর্মচারী বুধবার ও বৃহস্পতিবার নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছেন। এরপর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং শনিবার তিনি অফিসে যোগদান করবেন।
অর্থাৎ নৈমিত্তিক ছুটির সঙ্গে শুধু পরবর্তী দিকের একটি সাপ্তাহিক ছুটি সংযুক্ত হয়েছে।
প্রচলিত প্রশাসনিক প্রয়োগ অনুযায়ী নৈমিত্তিক ছুটির আগে অথবা পরে সাপ্তাহিক ছুটি বা সরকারি ছুটি সংযুক্ত করে ভোগ করা যায়। কেবল ছুটির এক পাশে সাপ্তাহিক বা সরকারি ছুটি থাকার কারণে ওই বন্ধের দিনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে গণনা করার কথা নয়।
সে হিসাবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করার পর শনিবার কর্মস্থলে যোগদান করলে সাধারণভাবে দুই দিনই নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে গণনা হওয়ার কথা।
শুধু শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় সেটিকে তৃতীয় দিনের নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে হিসাব করার দাবি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কখন মাঝখানের সাপ্তাহিক ছুটি হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্ন আসে?
বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর কর্মস্থলে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। তিনি বৃহস্পতিবার এবং শনিবার নৈমিত্তিক ছুটি নিলেন।
এক্ষেত্রে শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিনের নৈমিত্তিক ছুটির মাঝখানে পড়ে গেছে। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত অনুপস্থিতির একটি ধারাবাহিক সময় সৃষ্টি হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অনেক দপ্তরে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘স্যান্ডউইচ’ বা ‘ব্রিজিং’ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তখন মাঝখানের সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটির দিন গণনা নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক বিধান ও সংশ্লিষ্ট আদেশ প্রযোজ্য হতে পারে।
কিন্তু বুধবার ও বৃহস্পতিবার নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করার পর শনিবার অফিসে যোগদানের ঘটনা একই ধরনের নয়। এখানে সাপ্তাহিক ছুটি নৈমিত্তিক ছুটির মাঝখানে অবস্থান করছে না।
ছুটির উভয় পাশে সরকারি ছুটি থাকলে কী হবে?
নৈমিত্তিক ছুটির আগে ও পরে সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটি থাকলে ছুটি গণনার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়টি সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বহুল আলোচিত।
প্রচলিত প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী, নৈমিত্তিক ছুটির উভয় পাশে সরকারি ছুটি থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক পাশের সরকারি ছুটি নৈমিত্তিক ছুটির সময়সীমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্ন আসে। এ ক্ষেত্রে কোন পাশের ছুটি যুক্ত হবে, ধারাবাহিক অনুপস্থিতির মোট সময় কত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর দপ্তরে প্রযোজ্য বিশেষ ছুটি আদেশ রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
তবে এই বিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয় যে, নৈমিত্তিক ছুটির আগে অথবা পরে একটি সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে CL হিসেবে কেটে নিতে হবে।
সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে কি একই নিয়ম?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশের সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশেষায়িত সংস্থার ছুটি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ একই নিয়মে পরিচালিত হয় না।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালা, সার্ভিস রুলস, সংবিধি বা অনুমোদিত ছুটি বিধিমালা রয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং বিশেষ আইনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিজস্ব চাকরি বিধি প্রযোজ্য হতে পারে।
ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী কোন দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং তার চাকরিতে কোন ছুটি বিধিমালা প্রযোজ্য—সেটি নিশ্চিত না হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।
‘BSR-এ আছে’ বললেই কি যথেষ্ট?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিষয়টির সমাধান হিসেবে শুধু ‘BSR দেখুন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে নৈমিত্তিক ছুটির সব নিয়ম বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের একটি নির্দিষ্ট ধারায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
সরকারি কর্মচারীদের নৈমিত্তিক ছুটির অনেক বিষয় বিভিন্ন সময়ে জারি করা সরকারি আদেশ, অফিস মেমোরেন্ডাম, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় বা বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং পরবর্তীতে সংকলিত ছুটি সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে।
তাই কোনো কর্মচারীর ছুটি তিন দিন হিসেবে গণনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কোন বিধি, সরকারি আদেশ, পরিপত্র বা অফিস মেমোরেন্ডামের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করা।
কর্মচারীর করণীয় কী?
এ ধরনের বিরোধ দেখা দিলে মৌখিক বিতর্কে না গিয়ে কর্মচারীর উচিত লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা সংস্থাপন শাখার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া।
তিনি জানতে চাইতে পারেন—বুধবার ও বৃহস্পতিবার অনুমোদিত নৈমিত্তিক ছুটির সঙ্গে শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত করে মোট তিন দিন CL হিসেবে গণনা করার আইনগত ভিত্তি কী এবং কোন সরকারি আদেশ, পরিপত্র বা বিধির অধীনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ বা পরিপত্রের সত্যায়িত কপি কিংবা স্মারক নম্বরও চাওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা
উত্থাপিত ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করার পর শনিবার যথারীতি অফিসে যোগদান করলে শুধু শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ার কারণে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৃতীয় দিনের নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে গণনা করার যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়।
সাধারণ প্রশাসনিক প্রয়োগে এ ক্ষেত্রে দুই দিন নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবেই গণনা হওয়ার কথা।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব চাকরি বিধিমালা, বিশেষ সরকারি আদেশ বা ছুটি সংক্রান্ত পৃথক নির্দেশনার অধীন পরিচালিত হয়, তাহলে সেই বিধানই প্রাধান্য পাবে।
তাই কর্তৃপক্ষ তিন দিন ছুটি গণনার সিদ্ধান্ত দিলে কর্মচারীর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো—সিদ্ধান্তটির পক্ষে প্রযোজ্য বিধি, পরিপত্র, সরকারি আদেশ বা স্মারক নম্বর লিখিতভাবে জানতে চাওয়া।
কারণ সরকারি চাকরিতে ছুটি অনুমোদন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার হলেও অনুমোদিত ছুটি কত দিন হিসেবে গণনা হবে, তা প্রচলিত বিধিবিধান ও প্রযোজ্য সরকারি আদেশের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।



