প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা, ২০২০ সালের গ্রেড থেকে আবার ১০ বছর গণনার ইঙ্গিত
সরকারি চাকরিজীবীদের উচ্চতর গ্রেড বা প্রচলিত অর্থে টাইমস্কেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, টাইমস্কেলসহ কোনো পদের উন্নীত স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর ১০ বছর পূর্তিতে প্রাপ্য ১ম উচ্চতর গ্রেড আগেই পাওয়া উচ্চতর গ্রেডের সঙ্গে সমন্বয় হবে।
চিঠিটির বিষয়বস্তু বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে। কারণ, অনেক শিক্ষক ২০১৪ সালে একটি উন্নীত স্কেল এবং পরবর্তীতে ২০২০ সালে আরেকটি উন্নীত গ্রেড পেয়েছেন। ফলে ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেডকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের ১০ বছর গণনা হবে কি না—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন রয়েছে, নতুন চিঠির ব্যাখ্যা সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
চিঠিতে কী বলা হয়েছে
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের চিঠির বিষয় হলো—‘টাইমস্কেলসহ পদের উন্নীত স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর ১০ বছর পূর্তিতে ১ম উচ্চতর গ্রেডের বিষয়ে মতামত প্রদান প্রসঙ্গে’। চিঠিতে অর্থ বিভাগের ২৪ জানুয়ারি ২০২২ তারিখের একটি স্মারকের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, চাকরিতে ১০ বছর পূর্তিতে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী প্রাপ্য ১ম উচ্চতর গ্রেড পূর্বে প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেডের সঙ্গে সমন্বয় হবে।
অর্থাৎ, কোনো কর্মচারী চাকরির মধ্যে আগে থেকেই টাইমস্কেল, উন্নীত স্কেল বা উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পেয়ে থাকলে, পরবর্তী সময়ে ১০ বছর পূর্তিতে নতুন করে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের সুবিধাটিও হিসাবের মধ্যে নিতে হবে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রকাশিত নাগরিক সনদেও জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী একই পদে ১০ বছর পূর্তিতে ১ম উচ্চতর গ্রেড এবং পরবর্তী ৬ বছর পূর্তিতে ২য় উচ্চতর গ্রেডের বিধানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ২০১৪ সালে পদের উন্নীত স্কেলের সুবিধা পেয়েছেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীত করা হয়। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—২০১৪ সালের সুবিধা এবং ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেডের পর ১০ বছরের হিসাব কীভাবে করা হবে?
চিঠিতে ‘পূর্বে প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেডের সঙ্গে সমন্বয়’-এর যে নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেডকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
সহজভাবে বিষয়টি এমন—
২০১৪ সালে উন্নীত স্কেল → ২০২০ সালে উন্নীত গ্রেড → এরপর ১০ বছর → ২০৩০ সালে ১ম উচ্চতর গ্রেডের প্রশ্ন।
অর্থাৎ, কোনো শিক্ষক যদি ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে উন্নীত গ্রেড পেয়ে থাকেন এবং ওই গ্রেডকে সর্বশেষ প্রাসঙ্গিক উন্নীত গ্রেড হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে ১০ বছর পূর্ণ হবে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ সালে। সে ক্ষেত্রে ২০৩০ সালে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি চিঠির নীতিগত ব্যাখ্যার আলোকে করা হিসাব। প্রত্যেক শিক্ষকের ব্যক্তিগত সার্ভিস রেকর্ড, পূর্বে পাওয়া টাইমস্কেল/উচ্চতর স্কেল, বেতন নির্ধারণের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োগের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
মাঝখানে আবার গ্রেড উন্নীত হলে কী হবে?
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মচারীর পদের স্কেল বা গ্রেড যদি আবার উন্নীত করা হয় এবং সেই উন্নীত স্কেলে নতুন করে বেতন নির্ধারণ করা হয়, তাহলে আগের উচ্চতর গ্রেডের সঙ্গে নতুন ১ম উচ্চতর গ্রেডের সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসবে।
অর্থাৎ, একজন কর্মচারী ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেডের পর ২০৩০ সালের আগে যদি আবার কোনো উন্নীত স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পান, তাহলে তার পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের হিসাব সরাসরি ২০২০ সাল থেকে করা হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। নতুন উন্নীত স্কেলটি কী ধরনের সুবিধা এবং কোন বিধানের অধীনে দেওয়া হয়েছে, সেটি যাচাই করে হিসাব করতে হবে।
এই কারণেই ‘উন্নীত স্কেল’ এবং ‘উচ্চতর গ্রেড’—দুটিকে একই বিষয় ধরে নেওয়া যাবে না। কোনো সুবিধা পদোন্নতির সমতুল্য কি না, নাকি শুধু পদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণ—এ পার্থক্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক শিক্ষক কি চাকরিজীবনে উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত হতে পারেন?
এই প্রশ্নটিই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিশেষ করে যেসব শিক্ষক দীর্ঘদিন চাকরি করেও ২০১৪ ও ২০২০ সালের উন্নীত স্কেলের কারণে নতুন করে ১০ বছরের হিসাবের মধ্যে পড়ছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় অনেক পিছিয়ে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো শিক্ষক যদি ২০০৯ সালে চাকরিতে যোগ দেন এবং ২০১৪ সালে উন্নীত স্কেল পাওয়ার পর ২০২০ সালে আবার উন্নীত গ্রেড পান, তাহলে ২০২০ সালের সুবিধাকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী ১০ বছর গণনা করা হলে ২০৩০ সালের আগে নতুন ১ম উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ নাও আসতে পারে।
অন্যদিকে, ২০১৯ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া কোনো শিক্ষকও যদি ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেডের আওতায় পড়েন, তাহলে তার ক্ষেত্রেও একই ২০২০-২০৩০ সময়কাল সামনে আসতে পারে। ফলে চাকরিতে যোগদানের সময়ের সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের মধ্যে প্রত্যাশিত পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে।
এ কারণেই শিক্ষক মহলে প্রশ্ন উঠছে—একজন শিক্ষক দীর্ঘ সময় চাকরি করার পরও যদি পদের উন্নীত স্কেলকে পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেড হিসেবে সমন্বয় করা হয়, তাহলে বাস্তবে তার চাকরিজীবনে ১ম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে?
‘উন্নীত স্কেল’ কি পদোন্নতি?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও প্রশাসনিক প্রশ্ন হলো—পদের স্কেল উন্নীত হওয়া আর পদোন্নতি পাওয়া এক বিষয় কি না।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর উচ্চতর গ্রেডের বিধানের মূল ধারণা হলো, একই পদে পদোন্নতি ছাড়া নির্দিষ্ট সময় চাকরি পূর্তির পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যেও ১০ বছর পূর্তিতে ১ম এবং পরবর্তী ৬ বছর পূর্তিতে ২য় উচ্চতর গ্রেডের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তাই কোনো পদের বেতন স্কেল উন্নীত করার ঘটনাকে যদি পদোন্নতি হিসেবে গণ্য না করা হয়, তাহলে সেটি উচ্চতর গ্রেডের হিসাবকে কীভাবে প্রভাবিত করবে—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও মূল বিতর্কের জায়গা এখানেই। শিক্ষকরা যদি ২০২০ সালের গ্রেড উন্নীতকরণকে পদোন্নতি হিসেবে না দেখে থাকেন, তাহলে ২০২০ সাল থেকে নতুন করে ১০ বছর গণনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে, যদি সেটিকে পূর্বে প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেড হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে চিঠিতে উল্লেখিত ‘সমন্বয়’ নীতি কার্যকর হতে পারে।
হিসাব অফিসের জন্য চিঠির গুরুত্ব
নতুন চিঠিটি মূলত হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় একই ধরনের ব্যাখ্যা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। চিঠিটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট হিসাব কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং সেখানে অর্থ বিভাগের পূর্ববর্তী নির্দেশনার ভিত্তিতে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর উচ্চতর গ্রেডের প্রস্তাব পরীক্ষা করার সময় শুধু চাকরিতে যোগদানের তারিখ দেখা যথেষ্ট হবে না। তার সার্ভিস বুক ও বেতন নির্ধারণের ইতিহাসে আগে কোনো টাইমস্কেল, উন্নীত স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিক্ষকদের জন্য বাস্তব অর্থ কী?
সবচেয়ে সহজ ভাষায় বলা যায়, কোনো শিক্ষক আগে উন্নীত স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে পরবর্তী ১০ বছর পূর্তির উচ্চতর গ্রেড স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের সুবিধা উপেক্ষা করে দেওয়া হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং আগের প্রাপ্ত সুবিধার সঙ্গে নতুন উচ্চতর গ্রেডের সমন্বয় করার বিধান রয়েছে। ফলে একই কর্মচারী কখন, কোন স্কেলে, কোন আদেশে এবং কীভাবে বেতন নির্ধারণ পেয়েছেন—তার ওপর পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ভর করবে।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তাই ২০১৪ সালের উন্নীত স্কেল, ২০২০ সালের উন্নীত গ্রেড এবং পরবর্তী ১০ বছর পূর্তির সময়—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
সম্ভাব্য সময়রেখা
২০১৪ → উন্নীত স্কেল
২০২০ → আরও এক ধাপ উন্নীত গ্রেড
২০৩০ → ২০২০ সালের সুবিধাকে ভিত্তি ধরে ১০ বছর পূর্তির পর ১ম উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা বিবেচনা
এর মধ্যে আবার নতুন কোনো উন্নীত স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড দেওয়া হলে, সেই সুবিধার ধরন ও সরকারি আদেশ অনুযায়ী পরবর্তী হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে যে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার
চিঠিটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে এমন অর্থে নেওয়া উচিত নয় যে প্রত্যেক প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিশ্চিতভাবেই ২০৩০ সালের আগে উচ্চতর গ্রেড পাবেন না। কারণ ব্যক্তিভেদে নিয়োগের তারিখ, পূর্বে পাওয়া টাইমস্কেল/উন্নীত স্কেল, বেতন নির্ধারণের আদেশ এবং পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।
তবে চিঠির ভাষা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—আগে পাওয়া উচ্চতর গ্রেড বা টাইমস্কেলকে উপেক্ষা করে ১০ বছর পূর্তিতে নতুন উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার পরিবর্তে পূর্ববর্তী সুবিধার সঙ্গে সেটি সমন্বয়ের নীতি বিবেচনা করতে হবে।
ফলে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি বেতন-সুবিধার ক্ষেত্রে ২০১৪ ও ২০২০ সালের উন্নীত স্কেলের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন চাকরি করেও পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ‘১০ বছর গণনা কোন তারিখ থেকে হবে’—এই প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট, লিখিত ও অভিন্ন প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এখন সবচেয়ে জরুরি।
কারণ, এই হিসাবের ওপর নির্ভর করতে পারে একজন শিক্ষকের চাকরিজীবনে ১ম ও পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বাস্তব সুযোগ।



