ব্যাংকে টাকা জমা আছে? রিটার্নের প্রমাণ না দিলে সুদে ৫০ শতাংশ বেশি কর
ব্যাংকে সঞ্চয়ী, স্থায়ী বা মেয়াদি আমানত রাখা গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা Proof of Submission of Return (PSR) দিতে ব্যর্থ হলে আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর প্রযোজ্য উৎসে করের হারের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি হারে কর কর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতের সুদ-মুনাফা থেকে কেটে নেওয়া কর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে গত ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে পরিশোধিত সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তন এবং কর্তন করা কর নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে আয়কর আইন, ২০২৩-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রিটার্নের প্রমাণ না দিলে কেন ৫০ শতাংশ বেশি কর?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪২ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কর কর্তন বা সংগ্রহের ক্ষেত্রে করদাতা রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা PSR উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উৎসে কর প্রযোজ্য হারের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি হবে।
অর্থাৎ, কোনো আমানতকারীর ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মে যে হারে সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার কথা, তিনি প্রয়োজনীয় রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দিতে না পারলে সেই হারের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ যোগ করে কর কর্তন করতে হবে। তাই ব্যাংকে আমানত থাকলেও করসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা গ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব ধরনের আমানতের সুদ-মুনাফায় প্রযোজ্য
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু নির্দিষ্ট কোনো ধরনের আমানত নয়—সঞ্চয়ী আমানত, স্থায়ী আমানত, মেয়াদি আমানত কিংবা অন্য কোনো আমানতের বিপরীতে ব্যাংক যে সুদ বা মুনাফা পরিশোধ করে, তার ওপর প্রাপকের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে উৎসে কর কর্তন করতে হবে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১০২ অনুযায়ী এ কর কর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ফলে কোনো গ্রাহকের আমানতের সুদ বা মুনাফা পরিশোধের সময় তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করহার অনুসরণ করা ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক।
ব্যাংকের ভুলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ঠেকাতে নির্দেশনা
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সঠিক হারে উৎসে কর কর্তন না করায় পরবর্তী সময়ে কর সমন্বয় ও নিরীক্ষা কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে যথাযথভাবে কর কর্তন না হলে সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ কারণে ব্যাংকগুলোকে আমানতের সুদ-মুনাফা পরিশোধের সময় সঠিক করহার প্রয়োগ, গ্রাহকের প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং কর্তন করা অর্থ যথাসময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
কেটে নেওয়া কর ব্যাংকের হিসাবে রেখে দেওয়া যাবে না
শুধু গ্রাহকের কাছ থেকে কর কেটে নিলেই ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কর্তন করা উৎসে কর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো কর্তন করা উৎসে করের অর্থ জেনারেল লেজার বা অন্য কোনো হিসাবে নির্ধারিত সময়ের বেশি রেখে দিতে পারবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের কাছ থেকে কর হিসেবে কেটে নেওয়া অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে আটকে রেখে পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়ার সুযোগ নেই।
জুন মাসের কর জমার ক্ষেত্রে বিশেষ সময়সীমা
বাংলাদেশ ব্যাংক উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৩-এর ধারা ৮ অনুসারে কর জমা দেওয়ার সময়সীমাও স্পষ্ট করেছে।
অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত কোনো মাসে উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ করা হলে সংশ্লিষ্ট মাস শেষ হওয়ার পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
তবে জুন মাসের ক্ষেত্রে আলাদা সময়সীমা রয়েছে। জুনের ১ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে কর কর্তন বা সংগ্রহ করা হলে তা কর্তনের পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। আর জুনের অন্যান্য দিনে কর্তন বা সংগ্রহ করা অর্থ পরবর্তী দিনেই সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তথ্য ও নথি সংরক্ষণেও গুরুত্ব
কর্তন করা উৎসে কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। প্রয়োজনে কর্তন-সংক্রান্ত বিবরণী এবং চালানের কপি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
এর ফলে কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে কত টাকা কর কর্তন করা হয়েছে, কোন হারে কর কর্তন হয়েছে এবং সেই অর্থ কখন সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য পরবর্তীতে যাচাই করার সুযোগ থাকবে।
আমানতকারীদের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ব্যাংকে টাকা রাখলেই শুধু হবে না, আয়কর রিটার্ন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে যেসব আমানতকারীর সুদ বা মুনাফা থেকে নিয়মিত উৎসে কর কাটা হয়, তাদের ক্ষেত্রে PSR-এর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন—PSR না দিলে মূল আমানতের ওপর ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের কথা বলা হয়নি; বরং সংশ্লিষ্ট আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর প্রযোজ্য উৎসে করের হার ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে কর্তনের বিধান প্রযোজ্য হবে।
ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়ল দায়িত্ব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোর কর কর্তন ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। গ্রাহকের আমানতের ধরন, প্রাপকের শ্রেণি, প্রযোজ্য করহার এবং রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুদ বা মুনাফা পরিশোধের সময় সঠিক উৎসে কর কর্তন করতে হবে।
একই সঙ্গে কর্তন করা অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে তা অনুসরণ করতে হবে।
সার্বিকভাবে, নতুন নির্দেশনার লক্ষ্য হলো আমানতের সুদ-মুনাফা থেকে উৎসে কর কর্তনে অনিয়ম বন্ধ করা, ব্যাংকগুলোর কর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং সরকারের রাজস্ব যথাসময়ে সরকারি কোষাগারে পৌঁছানো নিশ্চিত করা। ফলে ব্যাংক আমানতকারীদের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও এখন করসংক্রান্ত নথিপত্র ও সময়সীমা মেনে চলার বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।



