আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, ৫১ ও ৪০ আসনের বাসে আলাদা ভাড়া
আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী ৫১ ও ৪০ আসনবিশিষ্ট বাসের জন্য সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পুনর্নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দীর্ঘপথের ২২৩টি রুটের দূরত্ব, কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া, টোল এবং টোলসহ যাত্রীপ্রতি আদায়যোগ্য ভাড়া আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিটির শিরোনামে “আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লা রুটে ৫১ ও ৪০ আসন বিশিষ্ট বাসের পুনঃনির্ধারিত (সেপ্টেম্বর/২৬) ভাড়ার তালিকা” উল্লেখ রয়েছে। নথির বিভিন্ন পাতায় বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর রয়েছে এবং শেষ পাতায় ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের স্বাক্ষরও দেখা যায়।
কিলোমিটারপ্রতি বাসভাড়া ২ টাকা ৪০ পয়সা
নতুন তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের হিসাবের ভিত্তি হিসেবে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৪০ পয়সা ভাড়া উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে যাত্রীপ্রতি চূড়ান্ত ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু দূরত্বের হিসাব করা হয়নি। প্রতিটি রুটে প্রযোজ্য সেতু, ফেরি ও অন্যান্য টোল আলাদাভাবে বিবেচনা করে তা যাত্রীপ্রতি ভাড়ার সঙ্গে যোগ করা হয়েছে।
এ কারণে একই দূরত্বের কাছাকাছি দুটি রুটের ক্ষেত্রেও টোলের পরিমাণ ভিন্ন হলে চূড়ান্ত যাত্রীভাড়ায় পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
৫১ ও ৪০ আসনের বাসে ভাড়া এক নয়
তালিকায় ৫১ আসন ও ৪০ আসনের বাসের জন্য পৃথক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। নথির হিসাব অনুযায়ী ৪০ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি মূল ভাড়া ৫১ আসনের বাসের তুলনায় বেশি।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো একটি রুটে ৫১ আসনের বাসের টোলবিহীন যাত্রীপ্রতি ভাড়া যদি ১,১৯২.৮০ টাকা হয়, একই রুটে ৪০ আসনের বাসের টোলবিহীন ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে প্রায় ১,৫২১ টাকা।
অর্থাৎ আসনসংখ্যা কম হওয়ায় ৪০ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি মূল ভাড়া বেশি রাখা হয়েছে।
টোল কীভাবে যাত্রীভাড়ায় যুক্ত হবে
নথির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাসের মোট টোল সরাসরি ৫১ বা ৪০ দিয়ে ভাগ করা হয়নি। বরং ৭০ শতাংশ যাত্রীবোঝাই ধরে টোলের যাত্রীপ্রতি অংশ হিসাব করা হয়েছে।
৫১ আসনের বাসের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ বোঝাই ধরলে কার্যকর যাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায়—
৫১ × ৭০% = ৩৫.৭ জন।
অন্যদিকে ৪০ আসনের বাসের ক্ষেত্রে—
৪০ × ৭০% = ২৮ জন।
ফলে কোনো রুটে মোট টোল ৩,০৬০ টাকা হলে ৫১ আসনের বাসের জন্য যাত্রীপ্রতি টোল হবে প্রায় ৮৫.৭১ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসের ক্ষেত্রে প্রায় ১০৯.২৯ টাকা।
এরপর এই টোল মূল যাত্রীভাড়ার সঙ্গে যোগ করে চূড়ান্ত টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
দীর্ঘ রুটে ভাড়ার পার্থক্য আরও স্পষ্ট
তালিকায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচলকারী দীর্ঘ দূরত্বের বেশ কিছু রুট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব রুটে দূরত্বের পাশাপাশি বড় সেতু, ফেরি বা অন্যান্য টোল যুক্ত হওয়ায় মোট ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে।
শেষ পাতার কয়েকটি রুটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
গাজীপুর–কুয়াকাটা রুট
গাজীপুর (শিববাড়ী) থেকে কুয়াকাটা রুটে জয়দেবপুর চৌরাস্তা, টঙ্গী, কুড়িল বিশ্বরোড, পদ্মা বহুমুখী সেতু, ভাঙ্গা, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা হয়ে যাত্রাপথের দূরত্ব ৩১৭ কিলোমিটার দেখানো হয়েছে।
এই রুটে ৫১ আসনের বাসের টোলবিহীন যাত্রীভাড়া প্রায় ৭৬০.৮০ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে প্রায় ৯৭০ টাকা। মোট টোল ৩,৬২৫ টাকা। ৭০ শতাংশ বোঝাই ধরে যাত্রীপ্রতি টোল ৫১ আসনের বাসে প্রায় ১০১.৫৪ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে প্রায় ১২৯.৪৬ টাকা।
সব মিলিয়ে তালিকায় ৫১ আসনের বাসের আদায়যোগ্য ভাড়া ৮৬২ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ১,০৯৯ টাকা দেখানো হয়েছে।
সিলেট–নোয়াখালী রুট
সিলেট থেকে নোয়াখালী রুটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, লাকসাম ও চৌমুহনী হয়ে যাত্রাপথের দূরত্ব ২৯৮ কিলোমিটার।
এ রুটে ৫১ আসনের বাসে টোলবিহীন যাত্রীভাড়া ৭১৫.২০ টাকা, ৪০ আসনের বাসে ৯১২ টাকা এবং মোট টোল ২৬০ টাকা। হিসাব অনুযায়ী চূড়ান্ত আদায়যোগ্য ভাড়া যথাক্রমে প্রায় ৭২২ টাকা ও ৯২১ টাকা।
নরসিংদী–খুলনা রুট
নরসিংদী থেকে খুলনা রুটে কাঁচপুর, পোস্তগোলা ব্রিজ, পদ্মা বহুমুখী সেতু, ভাঙ্গা ও ফকিরহাট হয়ে যাত্রাপথের দূরত্ব ২৪৭ কিলোমিটার।
এ রুটে ৫১ আসনের বাসের টোলবিহীন ভাড়া ৫৯২.৮০ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ৭৫৬ টাকা। মোট টোল ২,৭৩০ টাকা। টোল যুক্ত করার পর আদায়যোগ্য ভাড়া যথাক্রমে ৬৬৯ টাকা ও ৮৫৩ টাকা।
কুয়াকাটা–ঢাকা/অন্যান্য দীর্ঘ রুট
তালিকায় কুয়াকাটা, বরিশাল, খুলনা, যশোর, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী দীর্ঘপথের রুট রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়—দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক রুটের জন্যও পৃথকভাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
২২৩টি রুটের তথ্য এক তালিকায়
নথির প্রথম কলামে ক্রমিক নম্বর এবং পরের কলামে রুট নম্বর দেওয়া হয়েছে। তালিকাটি ক্রমিক ১ থেকে ২২৩ পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ নথিতে মোট ২২৩টি আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিটি রুটের ক্ষেত্রে মূলত যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—
- রুটের ক্রমিক নম্বর
- রুট নম্বর
- রুটের বিস্তারিত বিবরণ
- সওজ থেকে প্রাপ্ত দূরত্ব
- প্রতি কিলোমিটার ভাড়া
- ৫১ আসনের বাসে টোলবিহীন যাত্রীভাড়া
- ৪০ আসনের বাসে টোলবিহীন যাত্রীভাড়া
- সংশ্লিষ্ট টোলের পরিমাণ
- ৫১ আসনের বাসে ৭০ শতাংশ বোঝাই ধরে যাত্রীপ্রতি টোল
- ৪০ আসনের বাসে ৭০ শতাংশ বোঝাই ধরে যাত্রীপ্রতি টোল
- টোলসহ ৫১ আসনের বাসের আদায়যোগ্য ভাড়া
- টোলসহ ৪০ আসনের বাসের আদায়যোগ্য ভাড়া
সেতু ও ফেরির টোলও হিসাবের মধ্যে
নথির শেষের গুরুত্বপূর্ণ নোটে বলা হয়েছে, দূরত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) থেকে প্রাপ্ত দূরত্ব অনুসরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সওজের ব্রিজ, টোল ও ফেরি ভাড়ার তালিকাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো রুটে সেতু বা ফেরি পারাপারের খরচ থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট রুটের যাত্রীভাড়ার হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
দূরত্ব বা ভাড়ায় ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো রুটের দূরত্ব বা ভাড়ার পরিমাণ কম-বেশি পাওয়া গেলে যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে বিআরটিএ আনুপাতিক হারে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ রুটের ক্ষেত্রে সড়কের পরিবর্তন, নতুন সেতু চালু, ফেরি ব্যবস্থার পরিবর্তন কিংবা রুটের প্রকৃত দূরত্বের পরিবর্তনের কারণে ভাড়ার হিসাবেও পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।
যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নতুন তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বাসের আসনসংখ্যা বা কিলোমিটার বিবেচনা করলেই হবে না। চূড়ান্ত ভাড়া বুঝতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে—
দূরত্ব × ২.৪০ টাকা + প্রযোজ্য টোলের যাত্রীপ্রতি অংশ = টোলসহ আদায়যোগ্য ভাড়া।
এখানে টোলের যাত্রীপ্রতি অংশ নির্ধারণে ৭০ শতাংশ যাত্রীবোঝাইয়ের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে।
ফলে একই রুটে ৫১ আসন ও ৪০ আসনের বাসের ভাড়া সমান হবে না। আবার টোলের পরিমাণ বেশি এমন রুটে একই দূরত্বের অন্য রুটের তুলনায় মোট ভাড়াও বেশি হতে পারে।
সারসংক্ষেপ
বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পুনর্নির্ধারিত তালিকায় ৫১ ও ৪০ আসনবিশিষ্ট বাসের জন্য ২২৩টি আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুটের ভাড়া বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় প্রতি কিলোমিটার মূল ভাড়ার পাশাপাশি সেতু, ফেরি ও অন্যান্য টোলের হিসাব যুক্ত করে যাত্রীপ্রতি চূড়ান্ত আদায়যোগ্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কিলোমিটার ভাড়ার ভিত্তি ২ টাকা ৪০ পয়সা এবং টোল বণ্টনের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ বাসবোঝাই ধরে হিসাব করা হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি আপলোড করা বিআরটিএর নথির দৃশ্যমান তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন। কোনো নির্দিষ্ট রুটের বর্তমান ভাড়া জানতে হলে তালিকার সংশ্লিষ্ট রুট নম্বর ও সারির তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।



