ঈদুল ফিতরের আগেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ২০২৬ । ১৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে এই বিষয়ে?
দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই এই কার্ড বিতরণের প্রাথমিক কাজ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কমিটির গঠন ও নেতৃত্ব
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় যে, নবগঠিত এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন:
মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীগণ।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, মাহদী আমিন এবং রেহান আসিফ আসাদ।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং অর্থ, স্থানীয় সরকার, পরিকল্পনা ও আইসিটি বিভাগের সচিববৃন্দ।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৮ উপজেলা
প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) দেশের ৮টি বিভাগের ৮টি উপজেলায় এই ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তন করা হবে। যদিও কোন উপজেলাগুলোতে এই কার্যক্রম শুরু হবে তা কমিটির পরবর্তী বৈঠকে নির্ধারিত হবে। সফলভাবে পাইলটিং শেষ হওয়ার পর এটি পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
কার্ডের সুবিধা ও লক্ষ্য
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি তালিকাভুক্ত পরিবারকে মাসিক ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য প্রদান করা হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন: কার্ডগুলো মূলত পরিবারের গৃহিণীর নামে ইস্যু করা হবে যাতে পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
ডিজিটাল ডাটাবেজ: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজের সমন্বয়ে একটি ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) তৈরি করা হবে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং ভুয়া সুবিধাভোগী বাদ দিতে সাহায্য করবে।
কমিটির বর্তমান কর্মপরিকল্পনা
নবগঠিত কমিটিকে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি মূলত ফ্যামিলি কার্ডের উপযুক্ত ডিজাইন, সুবিধাভোগী নির্বাচনের মানদণ্ড এবং বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে এর সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আমাদের লক্ষ্য এই রমজান মাসেই কার্যক্রম শুরু করা যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ পালন করতে পারে।”

ফ্যামিলি কার্ড: সুবিধা ও প্রাপ্যতার বিস্তারিত গাইড
সরকার মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে সুরক্ষা দিতে এই কার্ড প্রবর্তন করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সরাসরি উপকারভোগীর হাতে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
১. প্রধান সুযোগ-সুবিধাসমূহ
এই কার্ডের মাধ্যমে মূলত দুই ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে:
সরাসরি আর্থিক সহায়তা: প্রতি মাসে কার্ডধারী পরিবারের অ্যাকাউন্টে বা মোবাইলে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা সরাসরি পাঠানো হতে পারে।
ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য: টিসিবি (TCB)-এর মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল ও চিনির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে কেনার সুযোগ থাকবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা: কার্ডটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল হওয়ায় কিউআর কোড (QR Code) বা স্মার্ট চিপের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে লেনদেন করা যাবে।
নারীর অগ্রাধিকার: পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহিণীর নামে কার্ড ইস্যু করায় এটি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে।
২. কারা এই কার্ড পাবেন (প্রাপ্যতা)
সবাই এই কার্ডের আওতায় আসবেন না। নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে:
| ক্যাটাগরি | বিবরণ |
| নিম্ন আয়ের পরিবার | যাদের মাসিক আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে (দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী)। |
| অসহায় ও দুস্থ | বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের পরিবার। |
| দিনমজুর ও প্রান্তিক চাষি | যাদের স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস নেই বা ভূমিহীন কৃষক। |
| শহরের বস্তিবাসী | শহরের অস্থায়ী বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত স্বল্প আয়ের মানুষ। |
৩. প্রাপ্তির প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইলট প্রকল্প শুরু হলে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে:
পাইলট এলাকা: শুরুতে ৮টি বিভাগের নির্বাচিত ৮টি উপজেলায় এটি চালু হবে।
প্রয়োজনীয় তথ্য: কার্ড পেতে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং পরিবারের সকল সদস্যের তথ্য প্রদান করতে হবে।
যাচাইকরণ: স্থানীয় প্রশাসন (ইউপি চেয়ারম্যান/মেয়র অফিস) এবং আইসিটি বিভাগ ডিজিটাল ডাটাবেজ যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা
প্রাথমিক প্রতিবেদন: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে কমিটি বিস্তারিত প্রস্তাবনা জমা দেবে।
কার্যকর: লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই সুবিধাভোগীদের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়া।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি একটি বিশেষ কর্মসূচি যা বর্তমানে চালু থাকা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (যেমন: বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা) কর্মসূচির সাথে সমন্বয় করা হবে যাতে একজন ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নিয়ে অন্যের হক নষ্ট না করেন।



