৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬: ৮ বছরেই প্রথম উচ্চতর গ্রেড, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেড পাওয়ার নিয়ম এবং আইবাস++ ফিক্সেশনে নতুন জটিলতা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা। বিশেষ করে একই পদে ৮ বছর চাকরি পূর্ণ হলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড, এরপর আরও ৬ বছর চাকরির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড এবং পদোন্নতির সুযোগবিহীন ব্লকড পদে নির্দিষ্ট শর্তে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হওয়া এবং বাস্তবে বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। নতুন বেতনস্কেলের বিধান অনুযায়ী অনেক কর্মচারী নিজেদের প্রাপ্যতা হিসাব করছেন। অন্যদিকে, আইবাস++ (iBAS++)-এ উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও সামনে আসছে।

বিশেষ করে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী আগে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও প্রশাসনিক বা সিস্টেমগত কারণে যাঁদের ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৬-এ বর্ণিত বিধান ও সরবরাহ করা তথ্যের আলোকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়ম, আগের বেতনস্কেলের সুবিধার প্রভাব এবং আইবাস++-এর ফিক্সেশন জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. একই পদে ৮ বছর চাকরি পূর্ণ হলেই কি প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে?

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী সরকারি কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে একটানা ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে চাকরি সন্তোষজনক হওয়া অন্যতম শর্ত। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে নবম বছরে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী তাঁর পদের মূল বেতন স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার অধিকারী হবেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চতর গ্রেড পাওয়া মানেই পদোন্নতি পাওয়া নয়। কর্মচারী আগের পদেই বহাল থাকবেন। তাঁর পদবি, দায়িত্ব কিংবা সাংগঠনিক অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে না। পরিবর্তন হবে মূলত বেতন কাঠামোতে।

অর্থাৎ, একজন কর্মচারী একই পদে ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করলেও পদোন্নতি না পেয়ে থাকলে তিনি নির্ধারিত শর্তে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

২. ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু ১০ বছর হয়নি—তাঁরা কি সুবিধা পাবেন?

নতুন বেতনস্কেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখকে কেন্দ্র করে বিশেষ সুবিধার বিধান।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যেসব স্থায়ী কর্মচারীর একই পদে চাকরির মেয়াদ ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু ১০ বছর পূর্ণ হয়নি, তাঁরাও ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হবেন।

এটি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পূর্ববর্তী ১০ বছরের পরিবর্তে নতুন বিধানে ৮ বছরের সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়:

  • কোনো কর্মচারী ১ জুলাই ২০১৬ তারিখে একই পদে যোগদান করেছেন।

  • ১ জুলাই ২০২৪ তারিখে তাঁর ৮ বছর চাকরি পূর্ণ হয়েছে।

  • ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে তাঁর চাকরির বয়স ১০ বছর।

  • প্রদত্ত বিধানের শর্ত পূরণ হলে তিনি ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

তবে প্রকৃত প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে যোগদানের তারিখ, একই পদে চাকরির ধারাবাহিকতা, স্থায়ীকরণ এবং পূর্বে পাওয়া বেতন-সুবিধার তথ্য যাচাই করা জরুরি।

৩. প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড কবে?

প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর কর্মচারীদের পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা কত বছর।

প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে পদোন্নতি ছাড়া আরও ৬ বছর চাকরি পূর্ণ করতে হবে। এই ৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা প্রাপ্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

উদাহরণ:

ধরা যাক, একজন কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলেন। তিনি একই পদে কর্মরত থাকলে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে ১ জুলাই ২০৩২ তারিখে ৬ বছর পূর্ণ হবে। সে অনুযায়ী ১ জুলাই ২০৩২ থেকে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা প্রাপ্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হবে।

এখানেও চাকরি সন্তোষজনক হওয়া এবং প্রযোজ্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।

৪. উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা কোন গ্রেড পর্যন্ত পাওয়া যাবে?

উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অনুচ্ছেদ ৬(৩) অনুসারে প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য।

অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেও এই সুবিধার মাধ্যমে চতুর্থ গ্রেডের ওপরে গিয়ে তৃতীয় বা তার চেয়ে উচ্চতর গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সুযোগ পাবেন না।

এ বিধানের ফলে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে না। কর্মচারীর বর্তমান গ্রেড ও প্রাপ্য পরবর্তী গ্রেড বিবেচনায় নিতে হবে।

৫. একই পদে সর্বোচ্চ কয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে?

সাধারণ নিয়মে একই পদে কর্মজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে এখানে পূর্ববর্তী বেতনস্কেলের সুবিধাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, কোনো কর্মচারী ২০১৫ সালের বেতনস্কেল বা তার আগের বেতনস্কেলের অধীনে একই পদে একাধিকবার সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল কিংবা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন বেতনস্কেলে তাঁর প্রাপ্যতা ভিন্ন হতে পারে।

প্রদত্ত বিধানের সারকথা হলো:

  • আগের বেতনস্কেলে একই পদে দুই বা ততোধিকবার সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন করে একই পদে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

  • আগে মাত্র একবার এ ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

  • আগে কোনো সুবিধা না পেয়ে থাকলে নতুন বেতনস্কেলের নির্ধারিত সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হবে।

অতএব, শুধু বর্তমান গ্রেড কিংবা চাকরির বয়স দিয়ে উচ্চতর গ্রেডের হিসাব করা যাবে না। পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও যাচাই করতে হবে।

৬. আগে একবার উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পেলে দ্বিতীয়বার পাওয়ার সুযোগ আছে কি?

এই প্রশ্নটি বর্তমানে অনেক সরকারি কর্মচারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অনুচ্ছেদ ৬(৫)-এ বলা হয়েছে, কোনো স্থায়ী কর্মচারী একই পদে চাকরিকালে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগে মাত্র একবার উচ্চতর স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে পরবর্তী ৬ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হবেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এই বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের সুযোগ থাকলেও ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগের কোনো সময়ের জন্য নতুন করে বকেয়া আর্থিক সুবিধা দাবি করার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ, নতুন বেতনস্কেলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা তৈরি হলেও সেটিকে অতীত সময়ের বকেয়া হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

উদাহরণ: কোনো কর্মচারী ১ জুলাই ২০১৬ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন। ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত তিনি একই পদে কর্মরত এবং দ্বিতীয়বার কোনো উচ্চতর গ্রেড পাননি। প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, তাঁর পরবর্তী ৬ বছর পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে আগের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার প্রকৃত তারিখ এবং একই পদে চাকরির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৭. পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ব্লকড পদে কি তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে?

উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত বিধানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড।

সাধারণভাবে একই পদে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিধান থাকলেও পদোন্নতির সুযোগবিহীন নির্দিষ্ট ব্লকড পদের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত এবং যেসব পদে পদোন্নতির কোনো বিধান নেই, সেসব পদে কর্মরত কর্মচারীরা নির্ধারিত শর্তে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পেতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে আরও ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করতে হবে। এরপর নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা প্রাপ্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

1. সংশ্লিষ্ট পদটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত হতে হবে।

2. ওই পদে পদোন্নতির কোনো বিধান থাকা যাবে না।

3. প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান পূরণ করতে হবে।

4. দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ৮ বছর চাকরি পূর্ণ করতে হবে।

5. চাকরি সন্তোষজনক হতে হবে।

6. একই পদে সমগ্র কর্মজীবনে তিনবারের বেশি উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাওয়া যাবে না।

7. তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে কার্যকর হবে না।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—কোনো পদে দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লকড পদ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট পদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা যাচাই করতে হবে।

৮. চাকরি সন্তোষজনক হওয়ার শর্ত কীভাবে নির্ধারিত হবে?

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু চাকরির মেয়াদ পূর্ণ করাই যথেষ্ট নয়। চাকরি সন্তোষজনক হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সন্তোষজনক চাকরির ক্ষেত্রে পদোন্নতিসহ প্রচলিত বিধিবিধানে যেভাবে সন্তোষজনক চাকরির শর্ত অনুসরণ করা হয়, উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির রেকর্ড, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (ACR/APAR), বিভাগীয় কার্যক্রম এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, নির্ধারিত বছর পূর্ণ হলেই প্রত্যেক কর্মচারী কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই উচ্চতর গ্রেড পাবেন—এমন ধারণা সঠিক নয়।

৯. উচ্চতর গ্রেড কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, নাকি অফিস আদেশ লাগবে?

এই বিষয়টি নিয়েও কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে উচ্চতর গ্রেডকে স্বয়ংক্রিয় সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে বেতন নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সুপারিশ প্রয়োজন হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব কিংবা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করে অফিস আদেশ জারি করতে হবে।

অর্থাৎ, উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা অর্জন এবং আইবাস++-এ নতুন বেতন কার্যকর হওয়া দুটি পৃথক বিষয়।

একজন কর্মচারীর নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হলেও তাঁর চাকরির তথ্য, পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেডের ইতিহাস এবং অন্যান্য শর্ত যাচাই করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।

সরকারি পর্যায়ে উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুরের উদাহরণও পাওয়া যাচ্ছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের একটি নোটিশে অনুচ্ছেদ ৬(১) অনুযায়ী একজন উপসচিবের অনুকূলে উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুরের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ+1

১০. আইবাস++-এ উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন নিয়ে কেন জটিলতা তৈরি হচ্ছে?

উচ্চতর গ্রেডের বিধান প্রকাশের পর কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে আইবাস++-এ বেতন নির্ধারণ।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত সময়ে প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণের অপশন চালু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা জানিয়েছেন।

কিন্তু অপশন চালু থাকা এবং প্রত্যেক কর্মচারীর ফিক্সেশন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়।

বিশেষ করে কয়েকটি সমস্যা সামনে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে:

  • উচ্চতর গ্রেডের অপশন দেখা গেলেও ফিক্সেশন চূড়ান্ত করতে সমস্যা হচ্ছে।

  • পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেড বা টাইম স্কেলের তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

  • পুরোনো বেতনস্কেলের অধীনে প্রাপ্য সুবিধা এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া কর্মচারীরা জটিলতায় পড়ছেন।

  • ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেলের অনুচ্ছেদ ৭(১) ও ৭(২) অনুযায়ী প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলোকে আইবাস++-এর নিশ্চিত কারিগরি ত্রুটি বলা যাবে না। ব্যক্তিগত চাকরির তথ্য, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ, অনুমোদন এবং সিস্টেমের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলেও ফিক্সেশন আটকে যেতে পারে।

১১. ২০১৫ সালের উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন নিয়ে পুরোনো জটিলতা

নতুন বেতনস্কেল কার্যকরের সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। অনেক কর্মচারী ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে নির্ধারিত সময়ে তাঁদের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়নি বলে দাবি করছেন।

এখন নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ায় তাঁদের প্রশ্ন হচ্ছে, আগের স্কেলের অনুচ্ছেদ ৭(১) ও ৭(২) অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে?

বিশেষ করে যাঁদের উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা ৩০ জুন ২০২৬-এর আগেই তৈরি হয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা অর্জনের তারিখ।

  • সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর বেতনস্কেল ও বিধান।

  • উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুরের অফিস আদেশ হয়েছিল কি না।

  • বেতন নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল কি না।

  • কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি কারণে ফিক্সেশন অসম্পূর্ণ ছিল কি না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—কোনো কর্মচারী বিধি অনুযায়ী উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা অর্জন করেছেন, কিন্তু অফিস আদেশ পাননি; আরেকজন কর্মচারী অফিস আদেশ পেয়েছেন, কিন্তু আইবাস++-এ ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়নি। এই দুটি পরিস্থিতির প্রশাসনিক সমাধান এক নাও হতে পারে।

তাই পুরোনো স্কেলের প্রাপ্য সুবিধা নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

১২. উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন সমস্যার সমাধানে কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্ন

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত: ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন অপশন চালু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা কি নির্বিঘ্নে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করতে পারছেন?

দ্বিতীয়ত: ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনস্কেলের অনুচ্ছেদ ৭(১) ও ৭(২) অনুযায়ী যাঁরা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তাঁদের অসম্পূর্ণ ফিক্সেশন কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে?

তৃতীয়ত: ২০১৫ সালের বেতনস্কেল অনুযায়ী যাঁদের উচ্চতর গ্রেডের অফিস আদেশ এখনো হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন বেতনস্কেলের বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে?

চতুর্থত: আইবাস++-এ পুরোনো বেতনস্কেলের মডিউল বন্ধ থাকলে পূর্ববর্তী সময়ের প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণের বিকল্প ব্যবস্থা কী?

পঞ্চমত: নতুন বেতনস্কেলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ধারণের জন্য কোনো সমন্বিত নির্দেশিকা বা বিস্তারিত পরিপত্র প্রকাশ করা হবে কি?

ষষ্ঠত: উচ্চতর গ্রেডের অফিস আদেশ জারির পর আইবাস++-এ ফিক্সেশন সম্পন্ন করতে কোন কোন নথি ও অনুমোদন প্রয়োজন হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর অর্থ বিভাগ, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং আইবাস++ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া গেলে কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে।

১৩. উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা যাচাইয়ে কর্মচারীদের কী কী তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে?

উচ্চতর গ্রেডের হিসাব করতে গিয়ে ভুল এড়াতে কর্মচারীদের কয়েকটি তথ্য যাচাই করা জরুরি।

যাচাইয়ের বিষয়প্রয়োজনীয় তথ্য
বর্তমান পদপদবি ও নিয়োগের ধরন
বর্তমান গ্রেডমূল পদের গ্রেড
চাকরিতে যোগদানযোগদানের তারিখ
স্থায়ীকরণস্থায়ীকরণের তারিখ ও আদেশ
একই পদে চাকরিমোট চাকরিকাল
পূর্ববর্তী সুবিধাটাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেড
পদোন্নতিপদোন্নতির আদেশ ও কার্যকর তারিখ
ব্লকড পদপ্রযোজ্য সরকারি ঘোষণা
চাকরির রেকর্ডসন্তোষজনক চাকরির প্রমাণ

বিশেষ করে একই পদে চাকরির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে পদ পরিবর্তন, পদোন্নতি, চাকরির বিরতি এবং পূর্ববর্তী উচ্চতর গ্রেডের তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

১৪. আপনার প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সম্ভাব্য হিসাব যেভাবে করবেন

নিচে কয়েকটি কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া হলো। এগুলো চাকরির মেয়াদ ও পূর্ববর্তী সুবিধার প্রভাব বোঝানোর জন্য তৈরি; ব্যক্তিগত প্রাপ্যতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

পরিস্থিতিসম্ভাব্য বিবেচনা
একই পদে ৮ বছর পূর্ণ, আগে কোনো সুবিধা নেইপ্রথম উচ্চতর গ্রেড
প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর আরও ৬ বছর পূর্ণদ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড
একই পদে আগে দুইবার সুবিধা পেয়েছেননতুন করে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত
আগে একবার উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেনশর্ত পূরণে দ্বিতীয়টির সুযোগ
ব্লকড পদে দুটি উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেনআরও ৮ বছর পর তৃতীয়টির সুযোগ
পদোন্নতি হয়েছেনতুন পদ ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী হিসাব প্রয়োজন

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৮ বছর, ৬ বছর কিংবা ৮ বছরের পরবর্তী মেয়াদ—প্রতিটি সময় গণনা নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী করতে হবে। সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রথম যোগদানের তারিখ থেকেই প্রতিটি উচ্চতর গ্রেডের সময় গণনা করা যাবে না।

১৫. শেষ কথা: উচ্চতর গ্রেডের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্বচ্ছ ফিক্সেশন ব্যবস্থা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা ও সুবিধা নিয়ে নতুন বিধান সরকারি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একই পদে ৮ বছর চাকরির পর প্রথম উচ্চতর গ্রেড, পরবর্তী ৬ বছর পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড এবং নির্দিষ্ট ব্লকড পদে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতনসংক্রান্ত প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে এই সুবিধা বাস্তবে কার্যকর করতে হলে শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের চাকরির তথ্য যাচাই, পূর্ববর্তী বেতনস্কেলের সুবিধা সমন্বয়, অফিস আদেশ জারি এবং আইবাস++-এ সঠিকভাবে বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে ২০১৫ সালের বেতনস্কেলে যাঁদের উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রশাসনিক বা কারিগরি জটিলতায় ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের বিষয়টি আলাদাভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি।

কর্মচারীরা যেন শুধু সিস্টেমে অপশন দেখতে না পান, বরং বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধাও যথাসময়ে বুঝে পান—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও আইবাস++ ফিক্সেশন নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ করা হোক, যাতে কোনো যোগ্য কর্মচারী প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত জটিলতায় তাঁর ন্যায্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *