সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি: পরীক্ষা কতবার দেওয়া যায় এবং নন-ক্যাডারদের বিধান কী?
সরকারি চাকরিতে বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে নন-ক্যাডার পদ পর্যন্ত পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরীক্ষা একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, পদোন্নতির পরীক্ষা হয়তো নির্দিষ্ট কয়েকবার দেওয়া যায়। কিন্তু বিধিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পদোন্নতির জন্য অনুষ্ঠিত ‘সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায়’ অংশগ্রহণের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সীমানা নেই।
১. পদোন্নতি পরীক্ষা কতবার দেওয়া যায়?
বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সহকারী সচিব (বা সমমানের পদ) থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতির জন্য ‘সিনিয়র স্কেল পদোন্নতি পরীক্ষা’ দিতে হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে বছরে দুইবার এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
অংশগ্রহণের সীমা: বর্তমান বিধি অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে স্থায়ী হওয়ার পর এই পরীক্ষায় যতবার খুশি (যতদিন বয়স ও চাকরির মেয়াদ থাকে) অংশগ্রহণ করতে পারেন। পরীক্ষায় ফেল করলে বা অংশগ্রহণ না করলে কোনো জরিমানা নেই, তবে পাস না করা পর্যন্ত পরবর্তী উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি পাওয়া সম্ভব হয় না।
শর্ত: সাধারণত চাকরিকাল ৪ বছর পূর্ণ হলে এবং চাকরিতে স্থায়ী হলে এই পরীক্ষায় বসা যায়।
২. ক্যাডার বহির্ভূত (নন-ক্যাডার) পদে পদোন্নতির নিয়ম
বিসিএস ক্যাডার ছাড়াও অন্যান্য সরকারি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরীক্ষা ও মূল্যায়নের বিশেষ বিধান রয়েছে। ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী:
পরীক্ষা ছাড়া পদোন্নতি নয়: নন-ক্যাডার ৯ম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অনেক সময় বিভাগীয় পরীক্ষা বা প্রশিক্ষণোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে কারিগরি বা টেকনিক্যাল পদগুলোতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর পরীক্ষায় পাস করতে হয়।
গ্রেডভিত্তিক পরীক্ষা: ১১তম থেকে ১০ম গ্রেড বা ১০ম থেকে ৯ম গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসির সুপারিশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ‘নন-ক্যাডার পদোন্নতি বিধিমালা ২০২৩’ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ফিডার পদে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার পর যোগ্য প্রার্থীরা পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হন।
৩. পরীক্ষা ছাড়াও কি পদোন্নতি হয়?
বিসিএস ক্যাডারে সিনিয়র স্কেল (৬ষ্ঠ গ্রেড) পর্যন্ত পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক হলেও, এর উপরের পদগুলোতে (উপসচিব, যুগ্ম সচিব ইত্যাদি) পদোন্নতির জন্য বর্তমানে কোনো সরাসরি ‘লিখিত পরীক্ষা’ নেই। তবে সেখানে রয়েছে ‘মূল্যায়ন পদ্ধতি’:
পয়েন্ট ভিত্তিক মূল্যায়ন: এসিআর (ACR), শিক্ষাগত যোগ্যতা, শৃঙ্খলা রেকর্ড এবং বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের নম্বরের ওপর ভিত্তি করে একটি স্কোর তৈরি করা হয়।
এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউ: উচ্চতর পদগুলোতে পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (SSB) কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার ও সামগ্রিক রেকর্ড যাচাই করে সুপারিশ করে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একনজরে
| বিষয় | বিবরণ |
| সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা | বিসিএস ক্যাডারদের জন্য বাধ্যতামূলক (৯ম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেড)। |
| পরীক্ষার সুযোগ | আনলিমিটেড (পাস না করা পর্যন্ত বারবার দেওয়া যায়)। |
| নন-ক্যাডার পদোন্নতি | বিভাগীয় পরীক্ষা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পিএসসির সুপারিশে হয়। |
| বিভাগীয় পরীক্ষা | প্রায় সব ক্যাডার ও গেজেটেড পদে স্থায়ী হতে হলে এই পরীক্ষায় পাস বাধ্যতামূলক। |
বিশ্লেষণ: সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি এখন আর কেবল জ্যেষ্ঠতার (Seniority) ওপর নির্ভর করে না। মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার উভয় ক্ষেত্রেই পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে। তবে পদোন্নতি পরীক্ষায় ফেল করলে চাকরি চলে যায় না, কেবল ক্যারিয়ারের গতি থমকে যায়।

সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে কি আর চাকরিজীবনে পদোন্নতি হয় না?
না, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে আপনার পরবর্তী উচ্চতর পদে পদোন্নতি হবে না। সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য এই পরীক্ষাটি একটি “বাধ্যতামূলক বাধা” বা ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। এই বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. পদোন্নতি আটকে যাওয়া (স্থবিরতা)
একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা সাধারণত ৯ম গ্রেডে (সহকারী সচিব বা সমমান) চাকরিতে যোগদান করেন। বিধি অনুযায়ী, ৬ষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র সহকারী সচিব বা সমমান) পদোন্নতি পেতে হলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক।
ফলাফল: আপনি যদি এই পরীক্ষায় পাস না করেন, তবে আপনি সারা জীবন ৯ম গ্রেডেই থেকে যাবেন। অর্থাৎ, আপনার ব্যাচমেটরা পদোন্নতি পেয়ে উপরে চলে গেলেও আপনি একই পদে পড়ে থাকবেন।
২. বেতন বৃদ্ধি ও ইনক্রিমেন্ট
পরীক্ষায় পাস না করলে শুধু পদোন্নতি নয়, আর্থিক সুবিধাতেও প্রভাব পড়ে:
ইনক্রিমেন্ট বন্ধ: নির্দিষ্ট সময় পর (সাধারণত চাকরিতে স্থায়ী হওয়ার নির্দিষ্ট সময় পর) পরীক্ষায় পাস না করা পর্যন্ত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে।
স্থায়ী হওয়া: চাকরিতে স্থায়ী বা কনফার্ম হওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় পরীক্ষা ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার সংশ্লিষ্টতা থাকে।
৩. উচ্চতর পদের দরজা বন্ধ
সিনিয়র সহকারী সচিব (৬ষ্ঠ গ্রেড) হতে না পারলে আপনি পরবর্তী ধাপগুলো যেমন—উপসচিব (৫ম গ্রেড), যুগ্মসচিব (৪র্থ গ্রেড) বা তার উপরের কোনো পদের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। অর্থাৎ, আপনার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ম গ্রেডেই আটকে যাবে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভয়বাণী:
যদিও বিষয়টি শুনতে কঠিন মনে হতে পারে, তবে আপনার জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে:
বারবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ: আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। আপনি বছরে দুইবার করে এই পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবেন। একবার ফেল করলে পরেরবার আবার দেওয়া যায়।
অংশ বিশেষ পাস: এই পরীক্ষার সব বিষয়ে একবারে পাস করতে হবে এমন নয়। আপনি যদি ৩টি বিষয়ের মধ্যে ২টিতে পাস করেন, তবে পরের বার শুধু বাকি ১টি বিষয়ে পরীক্ষা দিলেই চলে।
চাকরি চলে যায় না: পরীক্ষায় পাস করতে না পারার কারণে চাকরি চলে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। এটি কেবল আপনার পদোন্নতি এবং আর্থিক কিছু সুবিধা প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সারসংক্ষেপ: সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা হলো আপনার ক্যারিয়ারের “গেটপাস”। এটি ছাড়া পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কোনো বিকল্প পথ (Shortcut) ক্যাডার সার্ভিসে নেই।



