মোবাইল ফোনের দাম কমছে: আমদানি শুল্ক ৬০ শতাংশ কমালো এনবিআর
দেশে মোবাইল ফোনের বাজার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে এবং ডিজিটাল সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি করা ফিনিশড মোবাইল হ্যান্ডসেটের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ৬০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি, ২০২৬) এনবিআর এ সংক্রান্ত দুটি পৃথক স্ট্যাটুটরি নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারি করেছে।
শুল্ক হ্রাসের চিত্র
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফোন আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) বিদ্যমান ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমদানিকৃত ফোনের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে ৬০ শতাংশ। এর ফলে মোট করভার (Total Tax Incidence) ৬১.৮০ শতাংশ থেকে কমে ৪৩.৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, দেশীয় মোবাইল ফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অসম প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ে, সেজন্য কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতেও শুল্ক কমানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
দাম কতটা কমবে?
এনবিআর-এর হিসাব অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে মোবাইল ফোনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে:
আমদানিকৃত ফোন: ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের প্রতিটি ফিনিশড হ্যান্ডসেটের দাম প্রায় ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
দেশীয় সংযোজিত ফোন: একই ক্যাটাগরির (৩০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বের) দেশীয় ফোনের দাম কমবে প্রায় ১,৫০০ টাকা।
সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও শিক্ষার ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, চোরাচালান ও অবৈধ পথে ফোন আসা বন্ধ করতে নিবন্ধিত ও বৈধ আমদানিকারকদের উৎসাহিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
একই সাথে সরকার ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থা কার্যকর করার মাধ্যমে অবৈধ ও নকল হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রক্রিয়াও জোরদার করছে।
বাজার প্রতিক্রিয়া
এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতা ও প্রযুক্তি পণ্য ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের দাম ও উচ্চ শুল্কের কারণে মোবাইল ফোনের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং দেশের প্রযুক্তি শিল্প আরও বিকশিত হবে।

এতে কি বৈধভাবে ফোন আসার হার বাড়বে?
হ্যাঁ, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈধ পথে মোবাইল ফোন আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করবে:
১. শুল্ক হ্রাসের ফলে দামের ব্যবধান কমে আসা
এতদিন বৈধ পথে ফোন আমদানিতে মোট করভার ছিল প্রায় ৬১.৮০%। এর ফলে একই ফোনের দাম গ্রে-মার্কেট বা অবৈধ বাজারের তুলনায় অনেক বেশি হতো। এখন মোট করভার কমে ৪৩.৪৩% এ আসায় আমদানিকৃত ফোনের দাম প্রায় ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত কমবে। যখন অফিশিয়াল ও আন-অফিশিয়াল ফোনের দামের পার্থক্য খুব সামান্য হয়ে যাবে, তখন ক্রেতারা ঝুঁকি না নিয়ে ওয়ারেন্টিসহ বৈধ ফোন কিনতেই বেশি আগ্রহী হবেন।
২. এনইআইআর (NEIR) সিস্টেমের কঠোর প্রয়োগ
সরকার ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থা চালু করেছে। এর ফলে:
অবৈধ বা চোরাই পথে আসা ফোনের আইএমইআই (IMEI) বিটিআরসির ডেটাবেজে থাকবে না।
নিবন্ধিত নয় এমন ফোনগুলো ভবিষ্যতে নেটওয়ার্কে সচল থাকবে না।
মোবাইল ফোন ব্লক হয়ে যাওয়ার ভয়ে সাধারণ ক্রেতারা অবৈধ ফোন কেনা বন্ধ করে দেবেন, যা বৈধ আমদানিকারকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।
৩. গ্রে-মার্কেট বা ‘আন-অফিশিয়াল’ ফোনের বাজার সংকুচিত হওয়া
আগে চড়া শুল্কের কারণে চোরাচালান করা ফোনে অনেক বেশি লাভ থাকত। শুল্ক কমানোর ফলে এখন চোরাচালানকারীদের সেই লাভের জায়গা কমে যাবে। বিটিআরসি-র তথ্যমতে, দেশের স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশই ছিল গ্রে-মার্কেট বা অবৈধ ফোনের দখলে। এই নতুন নীতি কার্যকর হলে অবৈধ ফোনের দাপট কমে আসবে এবং আমদানিকারকরা একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ পাবেন।
সংক্ষেপে: একদিকে ফোনের দাম কমা এবং অন্যদিকে অবৈধ ফোন ব্যবহারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মানুষ বৈধ চ্যানেলের দিকেই বেশি ঝুঁকবে, যা সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে।



