শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি ভূতাপেক্ষভাবে মঞ্জুরের সুযোগ নেই, অর্থ বিভাগের অসম্মতি
সরকারি চাকরিজীবীদের শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আবারও সামনে এসেছে। শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি ভোগের পর সেটিকে ভূতাপেক্ষভাবে মঞ্জুর দেখিয়ে বিনোদন ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই—এমন অবস্থানই তুলে ধরা হয়েছে অর্থ বিভাগের একটি দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জনাব মো. নুরুল ইসলামের শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পরিশোধের বিষয়ে মতামত চাওয়া হলে অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগ এ ক্ষেত্রে সম্মতি দেয়নি। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক পত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাঁর অনুকূলে ভূতাপেক্ষভাবে শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা প্রদানের বিষয়ে অর্থ বিভাগের অসম্মতি রয়েছে। একই বিষয় নিয়ে প্রকাশিত তথ্যেও ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অর্থ বিভাগের অসম্মতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি আগে, নাকি পরে?
এখানেই বিষয়টির মূল গুরুত্ব। প্রচলিত বিধান ও অর্থ বিভাগের পূর্ববর্তী নির্দেশনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পাওয়ার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি যথাযথভাবে মঞ্জুর হওয়া এবং সেই ছুটি ভোগ করা।
অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির জন্য আবেদন করবেন, কর্তৃপক্ষ ছুটি মঞ্জুর করবে এবং মঞ্জুর করা ছুটি অনুযায়ী তিনি তা ভোগ করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী বিনোদন ভাতা পাওয়ার বিষয়টি কার্যকর হবে। এ কারণে ইতোমধ্যে অতিবাহিত সময়কে পরে ছুটি হিসেবে দেখিয়ে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুর এবং তার ভিত্তিতে ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই—এমন ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
অর্থ বিভাগের অসম্মতির নেপথ্যে যে বিষয়
প্রাপ্ত দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামের শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে অর্থ বিভাগের মতামত চাওয়া হয়।
এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রবিধি অনুবিভাগের প্রবিধি-৩ শাখা বিষয়টি পরীক্ষা করে মতামত দেয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুকূলে ভূতাপেক্ষভাবে শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা প্রদানের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রকাশিত নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে এ সিদ্ধান্তের তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ভাতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুরের সময়কাল এবং ভাতা প্রদানের সঙ্গে ছুটির বাস্তব সম্পর্ক সম্পর্কে একটি প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
ভূতাপেক্ষ ছুটি আর শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি এক বিষয় নয়
সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরনের ছুটি রয়েছে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু ছুটি ভূতাপেক্ষভাবে মঞ্জুরের নজিরও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সরকারি দপ্তরের নথিতে ভূতাপেক্ষ অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের ঘটনা দেখা যায়। খাদ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত নথিতেও বিভিন্ন সময় ভূতাপেক্ষ অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের আদেশের উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ এ ছুটির সঙ্গে বিনোদন ভাতা সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে শুধু অতীতে অনুপস্থিত থাকা বা ছুটি ভোগ করার ঘটনাকে পরে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি হিসেবে অনুমোদন করলেই সংশ্লিষ্ট ভাতা পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।
এ কারণেই শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদন ও নির্ধারিত সময়ে ছুটি ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৫ দিনের ছুটির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী, শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুর না হলে কিংবা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময়ের ছুটি হলে বিনোদন ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। প্রচলিত বিধির ব্যাখ্যায় শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা পাওয়ার জন্য ছুটি মঞ্জুর ও ছুটি গ্রহণের বিষয়টি যুগপৎভাবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু কাগজে-কলমে ভাতা দাবি করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট ছুটি বিধি অনুযায়ী ছুটি মঞ্জুর এবং ভোগের বিষয়টিও থাকতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য কী শিক্ষা?
এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়মিত করার চেষ্টা না করে সময়মতো আবেদন ও মঞ্জুর নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি দপ্তরগুলোতেও শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির আবেদনের সঙ্গে ছুটির প্রাপ্যতার প্রতিবেদন, পূর্ববর্তী শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুরের কপি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাগরিক সেবা সংক্রান্ত তথ্যেও গ্রেডভেদে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির জন্য যথাযথ আবেদন, ছুটি প্রাপ্যতার প্রতিবেদন এবং পূর্ববর্তী মঞ্জুরির কপি জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ফলে কোনো কর্মচারীর ছুটির সময় ঘনিয়ে এলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন শাখায় যথাসময়ে আবেদন করা এবং ছুটি মঞ্জুরের আদেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল ধারণা দূর করা জরুরি
অনেকের মধ্যে এমন ধারণা থাকতে পারে যে, কোনো কারণে সময়মতো শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুর না হলেও পরে তা ভূতাপেক্ষভাবে মঞ্জুর করে ভাতা নেওয়া সম্ভব। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত সেই ধারণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে ভূতাপেক্ষভাবে অন্য কোনো ধরনের ছুটি মঞ্জুরের নজির থাকা মানেই শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটিও একইভাবে ভূতাপেক্ষভাবে মঞ্জুর করা যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ প্রতিটি ছুটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি ও শর্ত আলাদাভাবে প্রযোজ্য।
শেষ কথা
সার্বিকভাবে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলামের শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা সংক্রান্ত ঘটনায় অর্থ বিভাগের অবস্থান হলো—ভূতাপেক্ষভাবে শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা প্রদানের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়নি।
এই সিদ্ধান্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বার্তা বহন করছে। শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি যথাসময়ে আবেদন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মঞ্জুর এবং নির্ধারিত নিয়মে ভোগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ছুটি ভোগের পর অতীত তারিখ থেকে ছুটি মঞ্জুর দেখিয়ে বিনোদন ভাতা নেওয়ার সুযোগ নেই—প্রচলিত বিধির ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্তের আলোকে বিষয়টি এভাবেই প্রতীয়মান হয়।



