বহি: বাংলাদেশ । শ্রান্তি বিনোদন ছুটি

বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জিও: ৩৫ দিন পার হলে কি জিও বাতিল? প্রকৃত যাত্রার তারিখ লেখা থাকলে কী হবে

বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জিও নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। বিশেষ করে জিও জারির তারিখ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে বিদেশযাত্রা শুরু করতে হবে কি না, নাকি জিওতে “প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ছুটি গণনা হবে” উল্লেখ থাকলে পরবর্তী তারিখেও যাওয়া যাবে—এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা মত।

একজন সরকারি কর্মচারীর প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার চিকিৎসাজনিত বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জিও স্বাক্ষর হয়েছে ৬ সেপ্টেম্বর। তিনি ১৪ অক্টোবর থেকে ৩০ দিনের ছুটি, অথবা প্রকৃত যাত্রার তারিখ থেকে ৩০ দিনের ছুটি চেয়েছেন। কিন্তু অফিস থেকে বলা হচ্ছে, জিওর ৩৫ দিনের সীমা অতিক্রম করলে নতুন করে আবেদন করতে হবে। ফলে ১২ অক্টোবর বিদেশযাত্রা করলে জিও কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

৩৫ দিনের বিধানটি আসলে কী?

বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, Part-I-এর Appendix-8-এর Rule 34 অনুযায়ী, অন্য কোনো বিশেষ আদেশ না থাকলে ছুটি মঞ্জুরের তারিখের ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি আরম্ভ করতে হবে। সরকারি বিভিন্ন অফিস আদেশেও এই বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ সাধারণ নিয়ম হচ্ছে—জিও বা ছুটি মঞ্জুরের তারিখ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি শুরু করতে হবে।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “অন্য কোনো বিশেষ আদেশ না থাকলে” কথাটি।

অর্থাৎ জিওতে যদি এমন কোনো বিশেষ শর্ত বা ভাষা থাকে যার মাধ্যমে ছুটির কার্যকারিতা প্রকৃত যাত্রার তারিখ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে, তাহলে বিষয়টি সাধারণ ৩৫ দিনের নিয়ম থেকে আলাদাভাবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে।

৬ সেপ্টেম্বরের জিও হলে ৩৫ দিন কখন শেষ হবে?

যদি জিওর তারিখ ধরা হয় ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, তাহলে সাধারণ ৩৫ দিনের হিসাব সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মিলিয়ে প্রায় ১১ অক্টোবরের মধ্যে পড়ে। তাই ১২ অক্টোবর থেকে ছুটি শুরু করতে চাইলে ৩৫ দিনের সাধারণ সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

তবে এখানে শুধু তারিখ গুনলেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। আসল বিষয় হলো আপনার জিওতে ঠিক কী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

“প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ৩০ দিন” লেখা থাকলে বিষয়টি ভিন্ন

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী যদি জিওতে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে—

“প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ৩০ (ত্রিশ) দিন”

অথবা এর কাছাকাছি কোনো ভাষা থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সরকারি চাকরির ছুটির বিধান নিয়ে প্রকাশিত ব্যাখ্যাতেও Rule 34-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—সাধারণভাবে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি শুরু করতে হয়; তবে প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ছুটি গণনার কথা উল্লেখ থাকলে পরবর্তী সময়ে যাত্রার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এমনকি বিভিন্ন বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আদেশে একদিকে নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের ছুটি এবং অন্যদিকে ৩৫ দিনের বিধান—দুই বিষয়ই একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে ১২ অক্টোবর যাওয়া যাবে কি?

এখানে সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর হলো—শুধু অন্যদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে ১২ অক্টোবর যাওয়া উচিত হবে না।

কারণ “বর্ডারে অনেকেই ৩৫ দিন পার হওয়ার পরও গেছেন” এবং “কোনো সমস্যা হয়নি”—এ ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রশাসনিকভাবে আপনার জন্য বৈধ অনুমতির বিকল্প নয়।

আপনার ক্ষেত্রে দেখতে হবে তিনটি বিষয়—

১. জিওতে ছুটির শুরুর তারিখ কী লেখা আছে।

২. “প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে” বা “actual date of journey” ধরনের কোনো শব্দ আছে কি না।

৩. জিওর শর্তাবলিতে Rule 34-এর ৩৫ দিনের বিধান সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে কি না।

এই তিনটির মধ্যে তৃতীয় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু জিওতে ৩৫ দিন লেখা নেই বলেই ৬ মাস বৈধ—এ ধারণা কতটা ঠিক?

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

“জিওতে ৩৫ দিনের কথা উল্লেখ নেই, তাই জিও ৬ মাস পর্যন্ত বৈধ”—এমন সাধারণ ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ম হিসেবে বিষয়টি ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।

কারণ Rule 34-এর মূল বিধানই হলো—অন্য কোনো বিশেষ আদেশ না থাকলে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি শুরু হবে।

অতএব জিওতে ৩৫ দিনের কথা আলাদাভাবে লেখা না থাকলেই ছয় মাসের একটি সাধারণ মেয়াদ সৃষ্টি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত বিধি থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না।

অনলাইনে এমন অভিজ্ঞতার কথাও পাওয়া যায় যে, ৩৫ দিন পার হওয়ার পরও কিছু ব্যক্তি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং বাস্তবে সমস্যা হয়নি; কিন্তু সেটিকে সর্বজনীন সরকারি বিধান হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।

অফিস কেন নতুন করে আবেদন করতে বলছে?

অফিসের অবস্থান সম্ভবত এই জায়গা থেকেই এসেছে যে, আপনার জিও ৬ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত হয়েছে এবং সাধারণ Rule 34 অনুসারে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি শুরু করার বিষয়টি প্রযোজ্য।

যদি আপনার চাওয়া প্রকৃত ছুটির শুরু ১২ অক্টোবর বা ১৪ অক্টোবর হয় এবং সেটি ৩৫ দিনের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে অফিস চাইতে পারে—

নতুন জিও/সংশোধিত জিও অথবা নতুন করে অনুমোদন।

প্রশাসনিক দিক থেকে এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি।

তবে আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান কী?

আপনার জিও যদি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়ে থাকে, তাহলে নতুন করে পুরো আবেদন করার আগে জিওর কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন/প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া বেশি যুক্তিসংগত।

বিশেষ করে লিখিতভাবে জানতে পারেন—

“জিওতে প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ৩০ দিন ছুটি ভোগের কথা উল্লেখ থাকায় ১২/১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিদেশ গমন করলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, Appendix-8, Rule-34-এর ৩৫ দিনের বিধান প্রযোজ্য হবে কি না এবং বিদ্যমান জিও অনুযায়ী উক্ত ভ্রমণ বৈধ হবে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্টীকরণ প্রদান করা হোক।”

এতে মৌখিক কথার পরিবর্তে আপনার হাতে একটি প্রশাসনিক ব্যাখ্যা থাকবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ৩৫ দিন মানে জিও “বাতিল” হওয়ার বিষয়টি সরলভাবে বলা ঠিক নয়

এখানে ভাষাগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

Rule 34-এর বক্তব্য হলো ছুটি মঞ্জুরের তারিখের ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি আরম্ভ করতে হবে

তাই “৩৫ দিন পার হলেই জিও বাতিল”—এভাবে সরাসরি বলা এবং “৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি আরম্ভ করা বাধ্যতামূলক”—এ দুটি বক্তব্য এক নয়।

তবে বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে যে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি শুরু হয়নি, তাহলে তারা নতুন অনুমোদন বা সংশোধিত আদেশ চাইতে পারে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে অফিসের লিখিত অবস্থান নেওয়াই নিরাপদ।

ভারতে গেলে বর্ডারে সমস্যা হবে না—এমন নিশ্চয়তা কি আছে?

না।

কেউ গেদে সীমান্ত দিয়ে আগে গেছেন, কারও কোনো সমস্যা হয়নি—এটি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আপনার ক্ষেত্রেও একই ফল হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

সরকারি নথিতেই দেখা যায়, বিভিন্ন দপ্তর বহিঃবাংলাদেশ ছুটির ক্ষেত্রে ৩৫ দিনের মধ্যে ছুটি ভোগের জন্য ছাড়পত্র গ্রহণের শর্ত স্পষ্টভাবে যুক্ত করছে।

তাই সীমান্তে কেউ কাগজ দেখে ছেড়ে দিয়েছে—এমন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সরকারি ছুটির বৈধতা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

চিকিৎসাজনিত ছুটির ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন

যেহেতু আপনার ছুটি চিকিৎসার জন্য, তাই ভিসা, মেডিকেল কাগজপত্র, জিও, ছুটির অনুমোদন এবং অফিসের ছাড়পত্র—সবগুলো যেন একই সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে জিওতে যদি লেখা থাকে “১৪ অক্টোবর হতে ৩০ দিন”, তাহলে ৬ সেপ্টেম্বর জিও হওয়ার পরও ১৪ অক্টোবরকে ছুটির নির্দিষ্ট শুরু হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর জিওর ভাষা দেখেই দিতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

আপনার ৬ সেপ্টেম্বরের জিওতে যদি স্পষ্টভাবে “প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে ৩০ দিন” বা সমজাতীয় বিশেষ শর্ত থাকে, তাহলে ৩৫ দিনের সাধারণ বিধানের সঙ্গে সেটির সম্পর্ক আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

আর যদি জিওতে শুধু ৩০ দিনের চিকিৎসা ছুটি মঞ্জুর থাকে, কিন্তু প্রকৃত যাত্রার তারিখ থেকে ছুটি গণনা হবে—এমন কোনো বিশেষ নির্দেশ না থাকে, তাহলে Rule 34-এর ৩৫ দিনের বিধান প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

সুতরাং “জিওতে ৩৫ দিন লেখা নেই = ছয় মাস বৈধ”—এটি নিশ্চিত সরকারি নিয়ম হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।

আপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো ৬ সেপ্টেম্বরের জিওর হুবহু ভাষা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে ১২/১৪ অক্টোবরের আগে সংশোধিত/স্পষ্টীকরণ জিও নেওয়া।

বিশেষ করে ১২ অক্টোবর যাত্রা করতে চাইলে অফিসের মৌখিক বক্তব্যের ওপর না থেকে লিখিত অনুমোদন বা স্পষ্টীকরণ নেওয়াই ঝুঁকিমুক্ত পদ্ধতি।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *