১১–১৫ গ্রেডে বাড়িভাড়া নিয়ে নতুন জটিলতার আশঙ্কা, পে-স্কেলের ভেটিংয়ে সংশোধনের দাবি
নতুন জাতীয় পে-স্কেলের খসড়ায় বাড়িভাড়া ভাতার হার নির্ধারণকে ঘিরে ১১–১৫ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কর্মচারী নেতাদের দাবি, মূল বেতনের ধাপভিত্তিক পার্থক্য তুলনামূলক কম থাকা সত্ত্বেও বাড়িভাড়া ভাতায় ১০ শতাংশ হারের ব্যবধান রাখায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিচের গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন উপরের গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় বেশি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির আগে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব এবং ১১–২০ গ্রেড সরকারি চাকরিজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহমুদুল হাসান এক লিখিত বক্তব্যে বিষয়টি সামনে এনেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাড়িভাড়া কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যেই নজরে এসেছে। এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আসবে—এমন প্রত্যাশা করছেন কর্মচারী নেতারা।
ভেটিং পর্যায় কেন গুরুত্বপূর্ণ
কোনো আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন বা নীতিমালার খসড়া চূড়ান্তভাবে জারি হওয়ার আগে আইনগত দিক থেকে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। এ প্রক্রিয়াকেই সাধারণভাবে ‘ভেটিং’ বলা হয়।
ভেটিংয়ের সময় মূলত খসড়ার ভাষা, শব্দচয়ন, আইনি পরিভাষা, বিদ্যমান আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং কোনো বিধান ভবিষ্যতে আইনগত বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়।
অর্থাৎ, মন্ত্রিসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পরও খসড়ার ক্ষেত্রে আইনগত যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ থাকে। এই পর্যায়ে কোনো অসংগতি বা আইনি ঝুঁকি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে। এরপর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন সরকারি গেজেট হিসেবে প্রকাশের প্রক্রিয়ায় যায়।
কোথায় তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা
কর্মচারী নেতাদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—১১ থেকে ১৫ গ্রেডের ক্ষেত্রে মূল বেতনের ব্যবধান তুলনামূলক কম হলেও বাড়িভাড়া ভাতার শতকরা হারে পার্থক্য রাখা হয়েছে।
এখানেই তৈরি হতে পারে কাঠামোগত অসামঞ্জস্য।
ধরা যাক, পাশাপাশি দুটি গ্রেডে কর্মরত দুই কর্মচারীর মূল বেতনের ব্যবধান খুব বেশি নয়। কিন্তু একটি গ্রেডের জন্য বাড়িভাড়া ৩৫ শতাংশ এবং অন্যটির জন্য ৪৫ শতাংশ নির্ধারিত হলে, মূল বেতনের সামান্য ব্যবধানের ওপর বাড়িভাড়ার অতিরিক্ত ১০ শতাংশ যোগ হয়ে মোট প্রাপ্য বেতনে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
আর যদি কোনো ক্ষেত্রে নিচের গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট ভাতার সমন্বিত প্রাপ্য উপরের গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় বেশি হয়ে যায়, তাহলে পে-স্কেলের অভ্যন্তরীণ বেতন-কাঠামোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কেন ১১–১৫ গ্রেডে ঝুঁকি বেশি
উচ্চতর গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে মূল বেতনের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। কিন্তু ১১–১৫ গ্রেডের ক্ষেত্রে কাছাকাছি ধাপের মূল বেতনের ব্যবধান তুলনামূলক কম হওয়ায় ভাতার শতাংশে বড় পরিবর্তনের প্রভাব বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
এ কারণে কর্মচারী নেতাদের আশঙ্কা, শুধু শতাংশ নির্ধারণের মাধ্যমে বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণ করা হলে কোনো কোনো ধাপে ‘পে কম্প্রেশন’ বা বেতন-ব্যবধান সংকুচিত হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ফলে একজন কর্মচারী পদমর্যাদায় তুলনামূলক নিচে থেকেও বাড়িভাড়া ভাতার কারণে মোট মাসিক প্রাপ্তিতে কাছাকাছি বা কোনো কোনো পরিস্থিতিতে বেশি অর্থ পেতে পারেন। এতে পদভিত্তিক বেতনক্রমের স্বাভাবিক ভারসাম্য প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কী ধরনের সংশোধনের প্রস্তাব
এই জটিলতা এড়াতে কর্মচারী নেতার পক্ষ থেকে তিনটি সম্ভাব্য সংশোধনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, ঢাকা মহানগরীর বাইরে অন্যান্য এলাকার জন্য প্রস্তাবিত বাড়িভাড়া হার ৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার পাশাপাশি একটি ন্যূনতম অর্থের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ বাড়িভাড়া ভাতা কোনোভাবেই ৯ হাজার বা ৯ হাজার ৫০০ টাকার নিচে না রাখার বিষয়টি বিবেচনায় আনার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা ছাড়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল সিটির জন্য প্রস্তাবিত ৪০ শতাংশ হার বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা অথবা বাড়িভাড়া ভাতার ন্যূনতম সীমা ১০ হাজার বা ১০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে।
তৃতীয়ত, ঢাকা সিটির জন্য প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতার হার বাড়িয়ে ৫৫ শতাংশ করা অথবা কোনো অবস্থাতেই তা ১২ হাজার বা ১২ হাজার ৫০০ টাকার নিচে না রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এগুলো এখন পর্যন্ত কর্মচারী পক্ষের প্রস্তাব বা সম্ভাব্য সংশোধনী—চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।
‘আইনি চ্যালেঞ্জের’ আশঙ্কা কেন
মাহমুদুল হাসানের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যাটি সংশোধন না হলে পে-স্কেল ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কোনো খসড়া প্রজ্ঞাপনে অসংগতি থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না কিংবা আদালতে চ্যালেঞ্জ হবেই—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। কোনো বিধান আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জযোগ্য কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট মূল আইন, ক্ষমতাপ্রদানকারী বিধান, বৈষম্যের প্রকৃতি এবং প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত ভাষার ওপর।
তবে একই কাঠামোর মধ্যে পদ বা গ্রেডের ঊর্ধ্বক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন আর্থিক সুবিধা তৈরি হলে সেটি নীতিগত ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। এ কারণেই গেজেট প্রকাশের আগে বিষয়টি খুঁটিয়ে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
ভেটিংয়ে কী হতে পারে
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে কি বাড়িভাড়া ভাতার কাঠামো পরিবর্তন হবে?
এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কর্মচারী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ভেটিংয়ের সময় বিষয়টি পর্যালোচনা করে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্যভাবে তিন ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হতে পারে—
- শতাংশের হার পুনর্নির্ধারণ;
- নির্দিষ্ট গ্রেড বা এলাকার জন্য ন্যূনতম বাড়িভাড়া নির্ধারণ;
- অথবা শতাংশ ও ন্যূনতম টাকার সীমা—দুই পদ্ধতির সমন্বয়।
এর মধ্যে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব, বাজেটীয় সক্ষমতা এবং পে-স্কেলের সামগ্রিক কাঠামোর ওপর।
কর্মচারীদের নজর এখন চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে
জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নতুন মূল বেতন কত হবে, সেটিই এখন কর্মচারীদের একমাত্র আগ্রহের বিষয় নয়। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, অন্যান্য ভাতা এবং গ্রেডভিত্তিক মোট প্রাপ্য—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাবই শেষ পর্যন্ত একজন কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করবে।
বিশেষ করে ১১–১৫ গ্রেডে মূল বেতনের ব্যবধান তুলনামূলক কম হলে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশের সামান্য পরিবর্তনও মোট আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কর্মচারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই বিষয়টি চূড়ান্ত গেজেটের আগে সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন পে-স্কেলের বাড়িভাড়া কাঠামো এখন ভেটিং পর্যায়ে কীভাবে পর্যালোচিত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৩৫%, ৪০% ও ৫০% হারের পরিবর্তে সংশোধিত হার আসবে কি না, নাকি ন্যূনতম টাকার সীমা যুক্ত হবে—তার উত্তর মিলবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই।
অতএব, কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমানে আলোচিত সংশোধনীগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না ধরে সরকারি গেজেটের অপেক্ষা করা।


