নবম পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন: ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো ভাতা, নতুন ভাতা মিলবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে বেতন ও ভাতা কার্যকরের সময়সূচি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বর্ধিত মূল বেতন একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না; তিন ধাপে তা সমন্বয় করা হবে। অন্যদিকে নতুন হারে বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা কার্যকর হবে আরও পরে—২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
ফলে নতুন পে-স্কেল অনুমোদিত হলেও ২০২৬ ও ২০২৭ সালের পুরো সময়জুড়ে সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে আসা মোট বেতনের কাঠামো এক ধাপে বদলে যাবে না। বিশেষ করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ভাতা কাঠামো বহাল থাকার বিষয়টি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ছবিতে উপস্থাপিত তথ্যের মূল বক্তব্যও এটাই।
২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কী হবে?
নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হলেও এর আর্থিক সুবিধা ধাপে ধাপে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, নতুন স্কেলে বেসিক যতটা বাড়ানো হয়েছে, তার পুরোটা প্রথম মাস থেকেই বেতনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল বেতনের—
- ৪০ শতাংশ প্রথম ধাপে,
- ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং
- ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে
সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্য প্রথম ধাপে বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নতুন মূল বেতন পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা, কিন্তু নতুন হারে আনুষঙ্গিক ভাতা পাওয়ার জন্য আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা।
এর মধ্যে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসবসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করে কার্যকর হবে। ফলে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একজন সরকারি কর্মচারী নতুন মূল বেতন পেলেও সব ভাতা নতুন হারে পাবেন না।
সহজভাবে সময়সূচিটি দাঁড়ায়—
| সময় | কী কার্যকর হবে |
|---|---|
| ১ জুলাই ২০২৬ | নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ |
| জানুয়ারি ২০২৭ | দ্বিতীয় ধাপ |
| জুলাই ২০২৭ | তৃতীয় ধাপ; নতুন মূল বেতন পূর্ণ হওয়ার কথা |
| ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত | বিদ্যমান ভাতা কাঠামো বহাল |
| ১ জানুয়ারি ২০২৮ | নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর |
এ কারণে ছবিতে উল্লেখ করা “২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ম পে-স্কেলের সকল ভাতা বিদ্যমান থাকবে”—এ বক্তব্যকে মূলত নতুন ভাতা কার্যকরের সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
২০তম গ্রেডে বেতন ২০ হাজার, প্রথম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার
অনুমোদিত নতুন কাঠামোয় আগের মতো ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মূল বেতন দ্বিগুণ হলেই হাতে পাওয়া মোট বেতনও সঙ্গে সঙ্গে দ্বিগুণ হবে না। কারণ নতুন মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে এবং বিভিন্ন ভাতার নতুন হার কার্যকর হচ্ছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
বিশেষ সুবিধা নিয়েও বড় পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে বর্তমানে চালু থাকা ১০ ও ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে।
বর্তমানে গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত ১০ শতাংশ এবং গ্রেড ১০ থেকে ২০ পর্যন্ত ১৫ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগের ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপনেও এ হার নির্ধারণের তথ্য রয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে এই বিশেষ সুবিধা সমন্বয়/বাতিল হওয়ার বিষয়টি চাকরিজীবীদের প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হিসাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু পুরোনো মূল বেতন ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্য দেখলেই প্রকৃত আর্থিক সুবিধা বোঝা যাবে না।
৯ম গ্রেডের একটি উদাহরণ
ধরা যাক, ৯ম গ্রেডে একজন চাকরিজীবীর পুরোনো প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা।
নতুন স্কেলে এটি বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হলে বর্ধিত অংশ দাঁড়ায় ২২ হাজার টাকা।
তিন ধাপে এই বর্ধিত অংশ যোগ হলে—
প্রথম ধাপ:
২২,০০০ × ৪০% = ৮,৮০০ টাকা
নতুন মূল বেতন = ৩০,৮০০ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ:
২২,০০০ × ৩০% = ৬,৬০০ টাকা
নতুন মূল বেতন = ৩৭,৪০০ টাকা
তৃতীয় ধাপ:
২২,০০০ × ৩০% = ৬,৬০০ টাকা
চূড়ান্ত মূল বেতন = ৪৪,০০০ টাকা
এরপর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে প্রযোজ্য ভাতাগুলো এই নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে হিসাব করার সুযোগ তৈরি হবে।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য আলাদা অগ্রাধিকার
নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে তুলনামূলক কম বেতন পাওয়া কর্মচারীদের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাই ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের প্রথম ধাপে তুলনামূলক বেশি অংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই শ্রেণির কর্মচারীরা প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ পাবেন।
এর ফলে স্বল্প বেতনভুক্ত কর্মচারীদের ওপর নতুন বেতন কাঠামোর প্রাথমিক প্রভাব তুলনামূলক দ্রুত পড়বে।
iBAS++ নিয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ছবিতে বলা হয়েছে, বিশেষ ধরনের বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের জন্য iBAS++-এ নতুন কোনো গেজেট বা আলাদা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। তবে এই ধরনের কারিগরি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্যকে চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন, অর্থ বিভাগের নির্দেশনা এবং বাস্তবায়ন আদেশ দেখা জরুরি।
কারণ গেজেটই হবে বেতন নির্ধারণ, ফিক্সেশন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খসড়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত বেতন হিসাব করা নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এবং কিছু বিষয় নিয়ে ভেটিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের জন্যও এটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ম্যাক্রো ফিসক্যাল ডাটাবেজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সারাংশ অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নয়—এই বাড়তি অর্থের সংস্থান, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
এ কারণেই পুরো সুবিধা একবারে না দিয়ে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি এবং পরে ভাতা কার্যকর করার পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। নতুন পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় এসেছে।
চাকরিজীবীদের জন্য মূল বার্তা
সব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে নবম পে-স্কেলের বাস্তব চিত্রটি হলো—২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর যাত্রা শুরু হলেও পূর্ণ সুবিধা একদিনে পাওয়া যাচ্ছে না। মূল বেতন তিন ধাপে সমন্বয় হবে এবং নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ১ জানুয়ারি ২০২৮ হবে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ।
তাই ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একজন চাকরিজীবীর বেতন স্লিপে নতুন মূল বেতন দেখা গেলেও বাড়িভাড়া বা অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রে পুরোনো কাঠামোর প্রভাব থাকতে পারে। নতুন ভাতাগুলো কার্যকর হওয়ার পরই নতুন পে-স্কেলের আর্থিক সুবিধার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো বেতন-ভাতা হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। অনুমোদিত পে-স্কেলের বাস্তব প্রয়োগে প্রজ্ঞাপনের ভাষাই হবে শেষ কথা।
সংক্ষেপে: ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন বেসিকের ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতা—এই তিনটি ধাপই নবম পে-স্কেলের আর্থিক বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।



