৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

১১–২০ গ্রেডের বাড়ি ভাড়া নিয়ে নতুন জটিলতা, ১০ শতাংশ পার্থক্য কমাতে সংশোধনের দাবি

নবম জাতীয় পে-স্কেলকে ঘিরে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতার কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে ১১–২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের একটি ফোরাম বাড়ি ভাড়া ভাতার বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত হার নিয়ে বৈষম্য ও জটিলতার কথা তুলে ধরে সংশোধনের দাবি জানিয়েছে।

ফোরামের সদস্য সচিব ও ১১–২০ গ্রেড সরকারি চাকরিজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসান-এর নামে প্রচারিত একটি দাবিনামায় বলা হয়েছে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতনের সঙ্গে তুলনা করলে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নির্ধারণে এমন একটি কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যাতে গ্রেডভেদে প্রকৃত সুবিধার পার্থক্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলো ফোরামের প্রস্তাবিত সংশোধনী; সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এগুলোকে দেখার সুযোগ নেই।

কোথায় জটিলতা দেখছে ১১–২০ গ্রেডের ফোরাম?

প্রচারিত দাবিনামায় বলা হয়েছে, সাধারণ কর্মচারীদের চোখে এখন বাড়ি ভাড়া ভাতার বিষয়টি একটি বড় ধরনের গোলদা বা জটিলতার সৃষ্টি করেছে। তাদের যুক্তি, শতাংশের হিসাবে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হলে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ওপর তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান। অন্যদিকে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক কম হওয়ায় একই ধরনের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে তাঁদের বাড়ি ভাড়া সুবিধা বাস্তবে কম পড়ে।

ফোরামের বক্তব্য অনুযায়ী, ১১–১৫ গ্রেডের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও স্পষ্ট, কারণ কাছাকাছি গ্রেডগুলোর মূল বেতনের পার্থক্য খুব বেশি না হলেও বাড়ি ভাড়া ভাতার শতাংশের পার্থক্য কর্মচারীদের মধ্যে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

এ কারণেই শুধু শতাংশ নির্ধারণ না করে ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া ভাতার একটি সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে।


যে তিনটি সংশোধনী চাওয়া হয়েছে

প্রচারিত দাবিনামার তথ্য বিশ্লেষণ করলে মূলত তিনটি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেখা যায়।

১. অন্যান্য এলাকায় বাড়ি ভাড়া ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ

ফোরামের প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে সাধারণ বা অন্যান্য এলাকায় বাড়ি ভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৩৫ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ করার দাবি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে শুধু শতাংশ নির্ধারণ না করে ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া ভাতা ৯ হাজার/৯ হাজার ৫০০ টাকার নিচে না রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

অর্থাৎ কোনো কর্মচারীর মূল বেতন নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া হিসাব করলে যদি সেই অর্থ ন্যূনতম সীমার নিচে চলে আসে, তাহলে তাঁকে ন্যূনতম নির্ধারিত অর্থ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।


২. ঢাকার বাইরে ব্যয়বহুল শহরে ৪০ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ

দ্বিতীয় প্রস্তাবটি করা হয়েছে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন ব্যয়বহুল সিটি বা শহর-এর জন্য।

দাবিনামা অনুযায়ী, এসব এলাকায় বাড়ি ভাড়া ভাতা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি বাড়ি ভাতা ১০ হাজার/১০ হাজার ৫০০ টাকার নিচে না রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এখানে মূল যুক্তি হলো—ঢাকার বাইরে হলেও সব এলাকার জীবনযাত্রার ব্যয় এক নয়। বিভাগীয় শহর ও অন্যান্য ব্যয়বহুল নগর এলাকায় বাসাভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেসব অঞ্চলের কর্মচারীদের জন্য আলাদা হার থাকা প্রয়োজন।


৩. ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি ঢাকার জন্য।

ফোরামের দাবিতে ঢাকা সিটি এলাকায় বাড়ি ভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

এর সঙ্গে ন্যূনতম বাড়ি ভাতা নির্ধারণেরও দাবি রয়েছে। দাবিনামায় ১২ হাজার/১২ হাজার ৫০০ টাকা-এর ন্যূনতম সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ ঢাকায় কর্মরত নিম্ন গ্রেডের কোনো কর্মচারীর মূল বেতন কম হওয়ার কারণে শতাংশের হিসাবে বাড়ি ভাতা খুব কমে গেলে, তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার দাবি করা হয়েছে।


কেন ন্যূনতম বাড়ি ভাতার দাবি গুরুত্বপূর্ণ?

শুধু শতাংশের হিসাবে বাড়ি ভাতা নির্ধারণ করলে মূল বেতন কম এমন কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণও কমে যায়।

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া হলে তিনি পাবেন—

২০,০০০ × ৩৫% = ৭,০০০ টাকা।

অন্যদিকে ৪০ শতাংশ করা হলে—

২০,০০০ × ৪০% = ৮,০০০ টাকা।

কিন্তু কোনো ন্যূনতম সীমা নির্ধারণ করা হলে কর্মচারী শতাংশের হিসাবে কম পেলেও নির্ধারিত ন্যূনতম অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এ কারণেই ফোরামের প্রস্তাবে শতাংশের পাশাপাশি ন্যূনতম টাকার সীমা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।


১০ শতাংশের পার্থক্যই কেন বড় বিষয়?

দাবিনামায় মূলত বলা হয়েছে, গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়ার হারে ১০ শতাংশের পার্থক্য তৈরি হলে সেটি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাস্তব সুবিধার ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

কারণ বাড়ি ভাড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ভাতা নয়; মূল বেতন যত বেশি, একই শতাংশে হিসাব করা বাড়ি ভাতার পরিমাণও তত বেশি।

ফলে একজন কর্মচারীর মূল বেতন তুলনামূলক কম হলে একই শহরে থেকেও তাঁর বাড়ি ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে।

ফোরামের যুক্তি হলো, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাস্তবে কম নয়। বিশেষ করে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় বাড়ি ভাতার কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।


তবে এটি কি চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত?

না।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। প্রচারিত পোস্টার বা দাবিনামায় থাকা ৪০%, ৪৫% ও ৫৫% হারকে এখনই নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত বাড়ি ভাড়া ভাতা হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ নিয়ে সরকার যে কাঠামো অনুমোদন করেছে, সেখানে মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের কথা এসেছে। স্বল্প আয়ের ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে বাড়ি ভাড়া ভাতার বিভিন্ন হার নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্রেড ও এলাকার ভিত্তিতে পৃথক হার প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে ১৬–২০ গ্রেডের জন্য ঢাকা সিটি এলাকায় ৬০ শতাংশ, অন্যান্য বড় শহরে ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৪৫ শতাংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচারিত খসড়া, প্রস্তাব, দাবি ও চূড়ান্ত সরকারি বিধানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই গেজেট বা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনে চূড়ান্ত হার প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি হারকে নিশ্চিতভাবে কার্যকর হার বলা ঝুঁকিপূর্ণ।


ফোরামের দাবির মূল লক্ষ্য কী?

দাবিনামার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয়কে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা যায়—

প্রথমত, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া সুবিধা বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, শুধু শতাংশের ওপর নির্ভর না করে ন্যূনতম একটি অর্থ নির্ধারণ করা।

তৃতীয়ত, ঢাকা, অন্যান্য ব্যয়বহুল শহর এবং দেশের অন্যান্য এলাকার জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে বাড়ি ভাতার কাঠামো নির্ধারণ করা।

এটি মূলত ভাতা কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য কমানোর দাবি হিসেবেই সামনে এসেছে।


পে-স্কেলের বাস্তবায়নের সঙ্গে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বাড়লে তার সঙ্গে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, টিফিনসহ বিভিন্ন ভাতার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ একজন সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত মাসিক আয় শুধু মূল বেতন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হওয়ার পরই মোট বেতন বা গ্রস আয়ের চিত্র পাওয়া যায়।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন ভাতা পরবর্তী পর্যায়ে কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে মূল বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি বাড়ি ভাতার শতাংশ, ন্যূনতম সীমা এবং অঞ্চলভেদে হার—এই তিনটি বিষয় ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


সামনে কী হতে পারে?

ফোরামের এই দাবির পর বাড়ি ভাড়া ভাতার কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা যদি যুক্তি দেন যে বর্তমান প্রস্তাবিত হার বাস্তব বাজারভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যূনতম বাড়ি ভাতা নির্ধারণের দাবি আরও জোরালো হতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত কোন গ্রেডে কত শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে, ন্যূনতম কত টাকা নির্ধারণ করা হবে এবং কোন শহর কোন শ্রেণিতে পড়বে—এসব বিষয় চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন/বিধি প্রকাশের পরই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

সারসংক্ষেপ

১১–২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের ফোরামের উত্থাপিত প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দু হলো—

  • অন্যান্য এলাকায়: ৩৫% → ৪০%
  • ঢাকার বাইরে ব্যয়বহুল শহরে: ৪০% → ৪৫%
  • ঢাকা সিটি এলাকায়: ৫০% → ৫৫%
  • পাশাপাশি প্রতিটি শ্রেণিতে ন্যূনতম বাড়ি ভাতা নির্ধারণের দাবি

অতএব, এটি আপাতত কর্মচারী ফোরামের সংশোধনী দাবি, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। নবম পে-স্কেলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এ দাবিগুলো কতটা গ্রহণ করা হয়, সেটিই এখন ১১–২০ গ্রেডের চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *