লোনের জামিনদার হলে দায় শুধু আপনার নয়, উত্তরসূরীর সম্পত্তিতেও পড়তে পারে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ফরমে যা বলা হয়েছে
ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে অনেকেই আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী বা পরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে জামিনদার হয়ে থাকেন। অনেকের ধারণা, ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ না করলে শুধু তাকেই আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত অভিন্ন Personal Guarantee Form-এর শর্তগুলো বলছে, জামিনদাতা হওয়া নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর মাধ্যমে জামিনদাতার ওপর একটি আইনগত দায় তৈরি হয় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই দায় তার উত্তরসূরি বা আইনগত প্রতিনিধির কাছে গিয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য অভিন্ন Personal Guarantee Form চালুর বিষয়ে BRPD-1 Circular No. 01 জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সার্কুলার তালিকাতেও ওই নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৭ নম্বর শর্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ফরমের ৭ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, গ্যারান্টি জামিনদাতা এবং তার উত্তরসূরীদের ওপর ব্যাংকের অনুকূলে একটি আইনগত দায় হিসেবে সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের গঠনগত পরিবর্তন, একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ হলেও ওই দায় বহাল থাকবে।
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি ঋণের জামিনদার হিসেবে স্বাক্ষর করার আগে বিষয়টি শুধু ‘আমি প্রয়োজনে সাহায্য করছি’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি একটি আইনগত অঙ্গীকারে প্রবেশ করছেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে—‘উত্তরসূরীর ওপর দায়’ মানেই উত্তরসূরী নিজের ব্যক্তিগত আয় বা নিজস্ব সম্পদ দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য—এমন সরল অর্থ করা ঠিক নয়। মৃত ব্যক্তির দায়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধির ৫০ ধারায় মৃত ব্যক্তির আইনগত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ডিক্রি কার্যকর করার সুযোগ থাকলেও দায় সাধারণভাবে মৃত ব্যক্তির যে সম্পত্তি আইনগত প্রতিনিধির হাতে এসেছে, তার সীমার মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে।
জামিনদারের দায় কতটা?
বাংলাদেশের Contract Act, 1872-এর ১২৮ ধারা অনুযায়ী, চুক্তিতে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না থাকলে জামিনদারের দায় মূল দেনাদারের দায়ের সঙ্গে সমপরিসরের। আইনের উদাহরণে মূল অর্থের পাশাপাশি সুদ ও প্রযোজ্য চার্জের দায়ের কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিন্ন ফরমেও বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, মূল দেনাদারের সঙ্গে জামিনদাতার দায় co-extensive বা সমপরিসরের এবং ঋণসংক্রান্ত মামলায় ব্যাংক জামিনদাতাকেও বিবাদী করতে পারে। আদালতের রায় বা ডিক্রি হলে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের বিরুদ্ধে যৌথ ও পৃথকভাবে তা কার্যকর করার বিধানও ফরমে রাখা হয়েছে।
এ কারণে ‘জামিনদার মানে শুধু সাক্ষী’—এই ধারণা বাস্তবে বিপজ্জনক হতে পারে।
ঋণগ্রহীতা খেলাপি করলে কী হতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরমের ১ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, মূল ঋণগ্রহীতা খেলাপি করলে ব্যাংকের প্রথম দাবির নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামিনদাতাকে ঋণের বকেয়া অর্থ, সুদ এবং প্রযোজ্য চার্জ ও ফি পরিশোধ করতে হতে পারে। ফরমে প্রথম দাবির নোটিশ পাওয়ার পর ৭ কর্মদিবসের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—ফরমে জামিনদাতার দায়কে ‘continuous security’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতার পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত গ্যারান্টি কার্যকর থাকার কথা বলা হয়েছে। আংশিক পরিশোধ করলেই গ্যারান্টি শেষ হয়ে যাবে—এমন নয়।
জামিনদাতা মারা গেলে কী হবে?
এই জায়গাটিই ৭ নম্বর শর্তকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের Contract Act-এর ১৩১ ধারা বলছে, সাধারণ নিয়মে কোনো জামিনদাতার মৃত্যু হলে তার continuing guarantee ভবিষ্যৎ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রত্যাহৃত হয়েছে বলে গণ্য হয়, যদি চুক্তিতে ভিন্ন কিছু না থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিন্ন Personal Guarantee Form-এর ৭ নম্বর শর্তে জামিনদাতা ও তার উত্তরসূরীদের ওপর আইনগত দায় বহাল থাকার কথা স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে জামিনদাতা মারা গেলে তার দায়ের কী পরিমাণ অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ওপর কার্যকর হতে পারে, সেটি চুক্তির ভাষা, বিদ্যমান আইন, আদালতের আদেশ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
সুতরাং বিষয়টি এমন নয় যে জামিনদাতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের দাবি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
উত্তরসূরীর ব্যক্তিগত সম্পদ কি ঝুঁকিতে?
এখানে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।
কেউ কোনো ব্যক্তির সন্তান, স্ত্রী বা উত্তরাধিকারী হলেই তার নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি দিয়ে মৃত জামিনদাতার ঋণ পরিশোধ করতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।
বাংলাদেশের Code of Civil Procedure-এর ৫০ ধারায় বলা হয়েছে, মৃত ডিক্রিদাতার বিরুদ্ধে ডিক্রি কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিনিধির দায় মৃত ব্যক্তির যে সম্পত্তি তার হাতে এসেছে এবং যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হয়নি, সেই সম্পত্তির পরিমাণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে।
অর্থাৎ বাস্তব আইনি প্রশ্নটি হলো—মৃত জামিনদাতার কী সম্পত্তি ছিল, তার কতটুকু উত্তরাধিকারী পেয়েছেন এবং সেই সম্পত্তির বিরুদ্ধে ব্যাংকের বৈধ দাবি কীভাবে কার্যকর করা হবে।
এ কারণে ‘জামিনদার হলে সন্তানদের নিজের পকেট থেকে ঋণ দিতে হবে’—এমন সরল বক্তব্যের বদলে বলা বেশি সঠিক যে জামিনদারের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষয়টি আদালত ও প্রযোজ্য আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।
ব্যাংক পরিবর্তন হলেও দায় থাকবে
৭ নম্বর শর্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু ব্যাংকের মালিকানা বা কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে গ্যারান্টি শেষ হবে না।
ফরমে বলা হয়েছে, ব্যাংকের সংবিধিবদ্ধ বা সাংগঠনিক পরিবর্তন, ব্যাংক একীভূতকরণ কিংবা অধিগ্রহণ হলেও গ্যারান্টির দায় বহাল থাকবে।
অর্থাৎ জামিনদাতা পরে বলতে পারবেন না যে ব্যাংকের কাঠামো বদলে যাওয়ায় তার দেওয়া গ্যারান্টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ হলে গ্যারান্টির অবসান
অন্যদিকে, একই ফরমে জামিনদাতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষার কথাও রয়েছে। ১০ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, প্রদত্ত ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পর গ্যারান্টি বাতিল বলে গণ্য হওয়ার কথা এবং গ্যারান্টি ফরমটি জামিনদাতার অনুকূলে ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ ঋণ সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হওয়ার পর গ্যারান্টির অবস্থান সম্পর্কে ব্যাংকের কাছ থেকে যথাযথ প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু আংশিক টাকা পরিশোধ করলেই দায় শেষ নয়
ফরমের ৫ নম্বর শর্তেও বিষয়টি স্পষ্ট। মূল ঋণগ্রহীতা অথবা জামিনদাতা ঋণের আংশিক অর্থ পরিশোধ করলেও গ্যারান্টি থেকে দায়মুক্তি ঘটে না।
তাই কোনো ঋণগ্রহীতা যদি কয়েকটি কিস্তি পরিশোধ করে পরে খেলাপি হন, তাতে জামিনদাতার দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।
ব্যাংক অতিরিক্ত সময় দিলে কী হবে?
৬ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংক মূল ঋণগ্রহীতাকে ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময় বা কিছু ছাড় দিলে, অথবা জামিনদাতার পূর্বসম্মতি নিয়ে ঋণের শর্ত পরিবর্তন করা হলে, শুধু সেই কারণে গ্যারান্টি বাতিল হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফরমে শর্ত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জামিনদাতার prior consent বা পূর্বসম্মতির কথাও উল্লেখ আছে। তাই ঋণের চুক্তি বা পরবর্তী সংশোধনীতে কী লেখা হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জামিনদার হওয়ার আগে যে বিষয়গুলো দেখা জরুরি
কোনো ব্যক্তি অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়ার আগে অন্তত এসব বিষয় যাচাই করা উচিত—
১. ঋণের মোট পরিমাণ কত
শুধু মাসিক কিস্তি নয়, মোট ঋণের পরিমাণ জানতে হবে।
২. সুদ ও অন্যান্য চার্জ কীভাবে হিসাব হবে
খেলাপি হলে মূল টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত সুদ, বিলম্ব ফি ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হতে পারে।
৩. গ্যারান্টির মেয়াদ কত
ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত গ্যারান্টি কার্যকর থাকার বিধান আছে কি না দেখতে হবে।
৪. জামিনদাতার দায়ের সীমা আছে কি না
চুক্তিতে নির্দিষ্ট সীমা দেওয়া আছে কি না পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জামিনদাতার মৃত্যুর পর কী হবে
চুক্তির উত্তরসূরি, legal representative এবং estate-সংক্রান্ত শর্তগুলো বিশেষভাবে পড়তে হবে।
৬. ঋণের শর্ত পরিবর্তন হলে কী হবে
পরবর্তীতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হলে জামিনদাতার সম্মতির বিধান কী, সেটিও দেখা দরকার।
৭. সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের পর প্রমাণপত্র নিতে হবে
ঋণ নিষ্পত্তির পর গ্যারান্টি অবসানের লিখিত প্রমাণ সংরক্ষণ করা নিরাপদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: জামিনদার মানেই ‘নামমাত্র সাক্ষী’ নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিন্ন ফরমের কাঠামো থেকে পরিষ্কার যে জামিনদারকে কেবল ঋণগ্রহীতার পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; তার স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্যাংকের অনুকূলে একটি আইনগত দায় সৃষ্টি হচ্ছে। ৩ নম্বর শর্তে জামিনদাতাকে মামলায় বিবাদী করার সুযোগ এবং ডিক্রি কার্যকরের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে Contract Act-এর ১২৮ ধারাও সাধারণভাবে জামিনদারের দায়কে মূল দেনাদারের দায়ের সঙ্গে সমপরিসরের করেছে।
তাই কারও অনুরোধে ‘শুধু স্বাক্ষর করে দিচ্ছি’ ভেবে ব্যাংক ঋণের জামিনদার হওয়া উচিত নয়। এটি একটি চুক্তিগত ও আইনগত দায়িত্ব।
শেষ কথা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের অভিন্ন Personal Guarantee Form ঋণের জামিনদারদের দায়িত্ব ও ঝুঁকিকে লিখিতভাবে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে ৭ নম্বর শর্তে জামিনদাতা ও তার উত্তরসূরীদের ওপর আইনগত দায়ের কথা উল্লেখ থাকায় জামিনদার হওয়ার আগে পুরো ফরমটি পড়ে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘উত্তরসূরী’ শব্দটির অর্থ এই নয় যে উত্তরাধিকারীরা কোনো সীমা ছাড়াই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ দিয়ে মৃত জামিনদাতার ঋণ পরিশোধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাধ্য হয়ে যাবেন। মৃত ব্যক্তির দায়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি এবং আদালতের মাধ্যমে দায় কার্যকরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন আলাদাভাবে বিবেচ্য।
অতএব, ব্যাংকঋণের জামিনদার হওয়ার আগে আবেগ নয়—চুক্তির প্রতিটি ধারা পড়ে, নিজের সম্ভাব্য দায় বুঝে এবং প্রয়োজন হলে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে ব্যাখ্যা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই আর্থিক সচেতনতার অংশ।



