ইত্যাদি । বিবিধ । ক্যাটাগরী বিহীন তথ্য

সোনালী ব্যাংকের পার্সোনাল লোনের সীমা ৪০ লাখ, মেয়াদ ৮ বছর: নতুন সুবিধা নিয়ে গ্রাহকদের আগ্রহের পাশাপাশি প্রশ্নও

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি তাদের পার্সোনাল লোন নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ব্যাংকের জেনারেল অ্যাডভান্সেস ডিভিশন থেকে ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা সংশোধনী অনুযায়ী, জামানতবিহীন পার্সোনাল লোনের সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ঋণসীমা ও মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণায় সম্ভাব্য গ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হলেও উচ্চ সুদের হার, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগ, কিস্তির চাপ এবং কারা এই ঋণের আওতায় আসবেন—এসব বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

২৮ জুন থেকে কার্যকর নতুন সিদ্ধান্ত

সোনালী ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫ মে ২০২৬ তারিখের সভায় জামানতবিহীন পার্সোনাল লোনের সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় পার্সোনাল লোনের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৮ বছর নির্ধারণ করা হয়।

ব্যাংকের সংশোধনীটি ২৮ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।

সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পেলেও সবাই একই পরিমাণ ঋণ পাবেন না

ব্যাংকের নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঋণগ্রহীতার পদমর্যাদা ও ঋণ মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ঋণসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেনারেল ম্যানেজার ও জেনারেল ম্যানেজার (ইনচার্জ) পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার পর্যায়ে ৩০ লাখ টাকা এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা, প্রিন্সিপাল অফিসার পর্যায়ে ৭ লাখ টাকা এবং সিনিয়র অফিসার পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ মঞ্জুরের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ৪০ লাখ টাকা সর্বোচ্চ সীমা হলেও আবেদন করলেই প্রত্যেক গ্রাহক ৪০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন—এমন নয়। আবেদনকারীর চাকরির মেয়াদ, পরিশোধ সক্ষমতা, মাসিক আয়, বিদ্যমান ঋণ এবং ব্যাংকের ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।

কারা পার্সোনাল লোনের জন্য আবেদন করতে পারবেন?

সংশোধিত নীতিমালায় ঋণগ্রহীতার চাকরির অবশিষ্ট মেয়াদসহ মোট চাকরিকাল বিবেচনায় ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৮ বছর হলেও আবেদনকারীর চাকরির অবশিষ্ট সময় কম থাকলে সেই অনুযায়ী ঋণের মেয়াদ কমে যেতে পারে।

ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লেন্ডিং ডিভিশন, জিএম অফিস, জিএম হেডেড কর্পোরেট শাখা, প্রিন্সিপাল অফিস বা সংশ্লিষ্ট কর্পোরেট শাখার কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে প্রকাশিত সংশোধনীতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ঋণ পাবেন—এমন কোনো আলাদা ঘোষণা নেই। তারা ঋণের জন্য যোগ্য হবেন কি না, তা সোনালী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পার্সোনাল লোন নীতিমালা, বেতন হিসাব, চাকরির ধরন, চাকরির স্থায়িত্ব, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট শাখার ঋণ মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে।

সুদের হার বর্তমানে ১২ শতাংশ

সোনালী ব্যাংকের সংশোধনীতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পার্সোনাল লোনের বর্তমান সুদের হার ১২ শতাংশ। ভবিষ্যতে সুদের হার পরিবর্তিত হলে সংশোধিত হার প্রযোজ্য হবে।

এ বিষয়টিই গ্রাহকদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের বক্তব্য, ১২ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিলে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

তবে ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিলে ৮ বছরে ঠিক কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, তা কেবল “৪০ লাখের বিপরীতে ৬০ বা ৬৫ লাখ টাকা” বলে নির্দিষ্ট করা সঠিক নয়। কারণ মোট পরিশোধের পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যাংক কোন পদ্ধতিতে সুদ হিসাব করছে, মাসিক কিস্তির পরিমাণ, ঋণ বিতরণের তারিখ, সুদের হার পরিবর্তন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য চার্জের ওপর।

ঋণসীমা বাড়লেও গ্রাহকদের অভিযোগ ‘হয়রানি’ নিয়ে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ঋণসুবিধার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তাদের অভিযোগ, কাগজপত্র সংগ্রহ, ঋণের যোগ্যতা যাচাই, জামিনদার, বেতন হিসাব, প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র এবং শাখা পর্যায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, ঘোষণায় বড় অঙ্কের ঋণের কথা বলা হলেও বাস্তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা নানা শর্ত ও অজুহাতে আবেদন নিরুৎসাহিত করেন। আবার অনেকে উচ্চ সুদের কারণে ঋণের মেয়াদ ৮ বছর থেকে আরও বাড়িয়ে ১৫ বা ২০ বছর করার দাবি জানিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগ ও দাবি গ্রাহকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মতামত। ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনায় ঋণ অনুমোদন সহজ করা, নথিপত্রের সংখ্যা কমানো কিংবা ঋণের মেয়াদ ২০ বছর করার কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ নেই।

৮ বছরের মেয়াদে সুবিধা যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে

ঋণের মেয়াদ ৫ বছর থেকে ৮ বছর করায় গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির চাপ তুলনামূলকভাবে কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদ মাসিক কিস্তিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সহায়তা করে।

তবে মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, ঋণগ্রহীতাকে তত বেশি সময় সুদ পরিশোধ করতে হবে। ফলে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ বেড়ে যেতে পারে।

এ কারণে ঋণ নেওয়ার আগে শুধু সর্বোচ্চ কত টাকা পাওয়া যাবে সেটি বিবেচনা না করে মাসিক কিস্তি, মোট সুদ, ঋণের কার্যকর সুদের হার, আগাম পরিশোধের নিয়ম এবং চাকরির অবশিষ্ট মেয়াদ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৪০ লাখ টাকা ঋণ মানেই সবার জন্য সুখবর নয়

সোনালী ব্যাংকের পার্সোনাল লোনের সীমা চার গুণ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে বড় নীতিগত পরিবর্তন। একই সঙ্গে ঋণের মেয়াদ ৮ বছর করায় যোগ্য গ্রাহকদের বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ এবং দীর্ঘ সময়ে পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ১২ শতাংশ সুদের হার, ঋণ পাওয়ার যোগ্যতার শর্ত, আবেদন প্রক্রিয়ায় গ্রাহকদের হয়রানির অভিযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন গ্রাহকের উচিত ঋণ নেওয়ার আগে ব্যাংক থেকে লিখিত কিস্তির সূচি বা Repayment Schedule সংগ্রহ করা। এতে প্রতি মাসের কিস্তি, মূল টাকা ও সুদের অংশ এবং ৮ বছর শেষে মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে—সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

সব মিলিয়ে, সোনালী ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তে পার্সোনাল লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৪০ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ৮ বছর হওয়ায় ঋণ গ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। তবে ঋণ পাওয়া নির্ভর করবে গ্রাহকের যোগ্যতা ও ব্যাংকের ঋণ মূল্যায়নের ওপর। আর উচ্চ সুদের কারণে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় ও পরিশোধ সক্ষমতা ভালোভাবে হিসাব করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

Source

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *