সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

এক সরকারি চাকরি ছেড়ে আরেক সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও আগের চাকরিকাল হারাবে না, মিলল বড় দৃষ্টান্ত

সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় নিয়ম মেনে অন্য একটি সরকারি পদে নতুন করে নিয়োগ পেলে আগের চাকরিকাল সবসময় বাতিল হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। নির্দিষ্ট বিধি ও শর্ত পূরণ হলে পূর্বের সরকারি চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে বিবেচনা এবং বেতন সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এরই একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে নরসিংদী কর অঞ্চলের একটি অফিস আদেশে।

নরসিংদী কর অঞ্চলের কর কমিশনারের কার্যালয় থেকে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা অফিস আদেশে জনাব শরীফ মিয়া নামের এক কর্মচারীর পূর্বের সরকারি চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা এবং বেতন সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আদেশটি প্রেরণ করা হয়েছে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার, নরসিংদীর কাছে।

কী ঘটেছিল শরীফ মিয়ার ক্ষেত্রে?

অফিস আদেশের তথ্য অনুযায়ী, শরীফ মিয়া কর অঞ্চল-নরসিংদীতে নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে অফিস সহায়ক (গ্রেড-২০) পদে নিয়োগ লাভ করেন এবং ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে নতুন পদে যোগদান করেন।

এর আগে তিনি কর অঞ্চল-০১, ঢাকা-এর অধীনে নিরাপত্তা প্রহরী (গ্রেড-২০) পদে কর্মরত ছিলেন। ওই পদে তিনি ৩ এপ্রিল ২০২২ থেকে ২৮ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থাৎ নতুন চাকরিতে যোগদানের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত তিনি পূর্বের সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন এবং পরদিনই নতুন সরকারি পদে যোগ দেন। ফলে তার ক্ষেত্রে আগের চাকরির সঙ্গে বর্তমান চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পূর্বের প্রায় চার বছরের চাকরিকাল গণনার অনুমতি

কর কমিশনারের আদেশে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সরকারি বিধি অনুসারে শরীফ মিয়ার পূর্বের চাকরিকাল ৩ এপ্রিল ২০২২ থেকে ২৮ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়কে বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে ওই সময়ের চাকরিকাল শুধু অতীতের চাকরি হিসেবে আলাদা হয়ে থাকছে না; বরং নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে তার বর্তমান সরকারি চাকরির হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হবে।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আদেশে পূর্বের চাকরিকালকে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনা এবং বেতন সংরক্ষণের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

বেতন সংরক্ষণ বলতে কী বোঝায়?

কোনো সরকারি কর্মচারী এক সরকারি পদ থেকে অন্য সরকারি পদে যোগ দিলে নতুন পদে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগের চাকরির বেতন-সংক্রান্ত সুবিধা হারানোর প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে প্রযোজ্য বিধি ও অনুমোদন থাকলে পূর্বের বেতন সংরক্ষণের সুযোগ পাওয়া যায়।

শরীফ মিয়ার ক্ষেত্রে কর কমিশনারের কার্যালয়ের আদেশে চাকরির ধারাবাহিকতার পাশাপাশি বেতন সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি কেবল চাকরিকাল গণনার বিষয় নয়; তার বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আদেশটির গুরুত্ব রয়েছে।

পেনশনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে

চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো পেনশনযোগ্য চাকরিকাল

কোনো কর্মচারীর পূর্বের সরকারি চাকরিকাল বিধি অনুযায়ী পেনশনযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত হলে, পরবর্তীতে অবসরকালীন সুবিধা নির্ধারণের সময় সেই চাকরিকাল বিবেচনায় আসতে পারে।

এ ধরনের পূর্বের চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা ও বেতন সংরক্ষণের সরকারি আদেশ বাংলাদেশে বিভিন্ন দপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকেও জারি হতে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালেও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তর চাকরির ধারাবাহিকতা ও বেতন সংরক্ষণ বিষয়ে পৃথক আদেশ প্রকাশ করেছে।

এমনকি সরকারি গেজেটেও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ, মোট পেনশনযোগ্য চাকরিকাল গণনা এবং বেতন নির্ধারণের উদাহরণ রয়েছে।

কোন বিধির ভিত্তিতে অনুমোদন?

নরসিংদী কর অঞ্চলের অফিস আদেশে বিসিএসআর (পার্ট-১)-এর বিধি ৪২(১) এবং ৩০০(বি) অনুসারে শরীফ মিয়ার পূর্বের চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা এবং বেতন সংরক্ষণের অনুমতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ এটি কোনো মৌখিক সিদ্ধান্ত বা সাধারণ সুবিধা নয়; সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধির আওতায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে দেওয়া একটি লিখিত অফিস আদেশ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—এক সরকারি চাকরি ছেড়ে আরেক সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেই প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের চাকরিকাল গণনা হবে—এমনটা বলা যাবে না। চাকরি পরিবর্তনের ধরন, নিয়োগের প্রক্রিয়া, অব্যাহতি ও যোগদানের ধারাবাহিকতা, প্রযোজ্য বিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

শরীফ মিয়ার ঘটনাটি সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক কর্মচারী এক সরকারি দপ্তরে চাকরি করার পর অন্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নতুন পদে যোগ দেন। তখন তাদের মধ্যে একটি সাধারণ উদ্বেগ থাকে—“আগের চাকরির কয়েক বছরের সার্ভিস কি তাহলে শেষ হয়ে যাবে?”

নরসিংদী কর অঞ্চলের এই আদেশ দেখাচ্ছে, নির্দিষ্ট বিধি ও শর্ত পূরণ হলে আগের চাকরিকাল সংরক্ষণের সুযোগ থাকতে পারে।

বিশেষ করে শরীফ মিয়ার ক্ষেত্রে—

  • পূর্বের চাকরি ছিল সরকারি;
  • পূর্বের পদ ও বর্তমান পদ দুটিই গ্রেড-২০;
  • পূর্বের চাকরি চলেছে ৩ এপ্রিল ২০২২ থেকে ২৮ জুন ২০২৬ পর্যন্ত;
  • নতুন পদে যোগদান করেছেন ২৯ জুন ২০২৬;
  • পূর্বের চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে;
  • পূর্বের চাকরিকালকে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে;
  • এবং বেতন সংরক্ষণেরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এটি কি সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় অধিকার?

না—এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।

একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে এমন অনুমোদন পাওয়া মানেই একই পরিস্থিতির প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী কোনো আবেদন ছাড়াই একই সুবিধা পাবেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস, পূর্বের পদ, নতুন নিয়োগের ধরন, চাকরি থেকে অব্যাহতির প্রক্রিয়া, যোগদানের সময় এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সরকারের বিভিন্ন দপ্তরেও পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল গণনা ও বেতন সংরক্ষণ বিষয়ে পৃথক পৃথক আদেশ জারি হওয়ার নজির রয়েছে। যেমন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একজন সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল গণনা ও বেতন সংরক্ষণ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে।

আবেদনকারীদের জন্য কী বার্তা?

এই ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন সরকারি চাকরিতে যোগদানকারী কর্মচারীদের পূর্বের চাকরির নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, অব্যাহতি/ছাড়পত্র, চাকরিকালের প্রত্যয়ন, শেষ বেতন সনদ (LPC) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ চাকরির ধারাবাহিকতা, পূর্বের চাকরিকাল গণনা বা বেতন সংরক্ষণের দাবি যাচাইয়ের সময় এসব নথি প্রয়োজন হতে পারে।

শেষ কথা

নরসিংদী কর অঞ্চলের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এই অফিস আদেশ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এতে দেখা যাচ্ছে, একজন কর্মচারী পূর্বের সরকারি চাকরি থেকে নতুন সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও নির্দিষ্ট বিধি ও শর্ত পূরণ এবং কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে পূর্বের চাকরিকাল বর্তমান চাকরির সঙ্গে গণনা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে বিবেচনা এবং বেতন সংরক্ষণের সুযোগ পেতে পারেন।

তাই “সরকারি চাকরি পরিবর্তন করলেই আগের চাকরিকাল পুরোপুরি শেষ”—এমন সাধারণ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। বরং প্রযোজ্য বিধি, চাকরির ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনই এখানে মূল বিষয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নরসিংদী কর অঞ্চলের শরীফ মিয়ার ক্ষেত্রে জারি করা আদেশটি একটি নির্দিষ্ট কর্মচারীর ব্যক্তিগত চাকরিকাল সংরক্ষণের অনুমোদন। এটিকে সব সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় বা নিঃশর্ত সুবিধা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

সোর্স ফাইল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *