সরকারি কাজে শব্দ ব্যবহার ২০২৬ । দাপ্তরিক কাজে বানান সচেতনতা ও ‘আনুষঙ্গিক’ শব্দের ব্যবচ্ছেদ কি?
প্রাত্যহিক দাপ্তরিক কাজ, সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক পত্রবিনিময়ে আমরা এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করি যেগুলোর বানান নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এর মধ্যে অন্যতম একটি শব্দ হলো ‘আনুষঙ্গিক’। সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই একটি শব্দ লিখতে গিয়ে অন্তত দশ ধরনের ভুল বানানের প্রচলন ঘটেছে, যা ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা: কেন ‘আনুষঙ্গিক’ শুদ্ধ?
বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী, এই শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘অনুষঙ্গ’ শব্দের সাথে ‘ইক’ (ষ্ণিক) প্রত্যয় যুক্ত হয়ে। ব্যাকরণের নিয়ম (তদ্ধিত প্রত্যয়) অনুযায়ী:
মূল শব্দ: অনুষঙ্গ (অণু + সঙ্গ)
প্রত্যয়: ইক
পরিবর্তন: যখন কোনো শব্দের সাথে ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়, তখন শব্দের প্রথম স্বরবর্ণের ‘বৃদ্ধি’ ঘটে। অর্থাৎ, ‘অ’ পরিবর্তিত হয়ে ‘আ’ হয়।
ণত্ব বিধান ও ষত্ব বিধান: ‘অনুষঙ্গ’ শব্দে ‘সু’ উপসর্গের প্রভাবে ‘স’ পরিবর্তিত হয়ে ‘ষ’ হয়েছে।
অতএব, $অ + নুষঙ্গ + ইক = আনুষঙ্গিক$।
প্রচলিত ভুলের চিত্র
দাপ্তরিক পত্রাবলীতে অনেকেই ‘আনুষাঙ্গিক’ (আ-কারসহ) লিখে থাকেন, যা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ। এছাড়া ‘ঙ-গ’ এর স্থলে ‘ঙ্গ’ ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও অনেকে ‘ং’ (অনুস্বার) ব্যবহার করেন। নিচে বিভ্রান্তির নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
| সঠিক বানান | ভুল বানান (প্রচলিত) | ভুলের কারণ |
| আনুষঙ্গিক | আনুষাঙ্গিক | প্রত্যয় যুক্ত হলে মাঝের বর্ণের সাথে আ-কার যুক্ত হয় না। |
| আনুষঙ্গিক | আনুসাঙ্গিক | ‘ষ’-এর পরিবর্তে ‘স’ ব্যবহার করা অশুদ্ধ। |
| আনুষঙ্গিক | আনুষংগিক | যুক্তবর্ণ ‘ঙ্গ’ এর বদলে ‘ংগ’ ব্যবহার বর্জনীয়। |
| আনুষঙ্গিক | অনুষঙ্গিক | প্রথম বর্ণের ‘বৃদ্ধি’ (অ থেকে আ) না করা। |
উপসংহার
ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখা কেবল ব্যাকরণবিদদের কাজ নয়, এটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। একটি দাপ্তরিক পত্রে ‘আনুষঙ্গিক’ এর মতো সাধারণ শব্দের ভুল প্রয়োগ পত্রের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। তাই সঠিক বানান চর্চার মাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অপরিহার্য।

দাপ্তরিক কাজে বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দের শুদ্ধাশুদ্ধি
১. সংশ্লিষ্ট (সংশ্লিষ্ট বনাম সংশ্লিষ্টতা)
অনেকে ভুল করে ‘সংশ্লিষ্ঠ’ (ষ্ট দিয়ে) লিখে থাকেন।
শুদ্ধ: সংশ্লিষ্ট
মনে রাখার কৌশল: এটি ‘সংশ্লেষ’ শব্দ থেকে এসেছে। তাই শেষে ‘ষ্ট’ নয়, বরং ‘ষ্ট’ এর পরিবর্তে ‘ষ্ট’ (ত) হবে।
২. অপরিহার্য (অপরিহার্য বনাম অপরিহার্য্য)
পুরানো অনেক নথিতে ‘য-ফলা’ সহ বানান দেখা গেলেও আধুনিক বাংলা একাডেমি প্রমিত নিয়ম অনুযায়ী এটি বর্জনীয়।
শুদ্ধ: অপরিহার্য
নিয়ম: রেফ-এর পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হয় না। তাই ‘য-ফলা’ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৩. প্রমিত (প্রমিত বনাম প্রমিতকরণ)
দাপ্তরিক ভাষায় ‘Standard’ বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
শুদ্ধ: প্রমিত
সতর্কতা: অনেকে একে ‘প্রমীত’ (দীর্ঘ-ঈ কার) লেখেন, যা ভুল। প্রমিত বানানে সবসময় হ্রস্ব-ই (ি) হবে।
৪. ইতোমধ্যে (ইতোমধ্যে বনাম ইতমধ্যে)
চিঠিপত্রে ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও ব্যাকরণগতভাবে ‘ইতোমধ্যে’ অধিকতর শুদ্ধ।
শুদ্ধ: ইতোমধ্যে
ব্যাকরণ: এটি বিসর্গ সন্ধির নিয়ম ($ইতঃ + মধ্যে = ইতোমধ্যে$) অনুযায়ী গঠিত। তবে আধুনিক বাংলায় ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটিও গৃহীত, কিন্তু ‘ইতোমধ্যে’ অধিক মার্জিত।
একনজরে দাপ্তরিক শব্দের সঠিক তালিকা
| অশুদ্ধ বানান | শুদ্ধ বানান | বিষয়/প্রসঙ্গ |
| উপোরক্ত / উপরোক্ত | উপর্যুক্ত | চিঠির শুরুতে রেফারেন্স দিতে। |
| স্বত্বাধিকারী | স্বত্বাধিকারী | মালিকানা বোঝাতে (ব-ফলা হবে)। |
| শত্ব | শর্ত | কন্ডিশন বোঝাতে। |
| কল্যান / করনীয় | কল্যাণ / করণীয় | ণত্ব বিধান অনুযায়ী ‘ণ’ হবে। |
| শ্রদ্ধাঞ্জলী | শ্রদ্ধাঞ্জলি | সকল ‘অঞ্জলি’ যুক্ত শব্দে ‘লি’ (হ্রস্ব-ই) হয়। |
| রেজিষ্ট্রেশন | রেজিস্ট্রেশন | ইংরেজি শব্দে ‘ষ্ট’ হয় না, ‘স্ট’ হয়। |
একটি ছোট টিপস: দাপ্তরিক কাজে কোনো শব্দের বানান নিয়ে দ্বিধা তৈরি হলে ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।



