সৎ পরিবার থেকে উঠে এসে কেন কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়ান?—সমস্যার শিকড় কোথায়
বাংলাদেশে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের সাধারণ পরিবার, কৃষক, শিক্ষক, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কিংবা সীমিত আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসেন। কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে—এই কর্মকর্তারা সততা, দক্ষতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।
কিন্তু সময়ে সময়েই দেশের বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কিছু উচ্চপদস্থ আমলা বা সাবেক সচিবের নাম আলোচনায় এসেছে। এতে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—যাঁরা সাধারণ ও সৎ পারিবারিক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ কেন ক্ষমতার শীর্ষে গিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন?
পরিবার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশই কি বড় কারণ?
দুর্নীতি বিশ্লেষক ও সুশাসন গবেষকদের মতে, কোনো ব্যক্তি দরিদ্র বা সৎ পরিবার থেকে এসেছেন—এটি ভবিষ্যতে তাঁর সততার নিশ্চয়তা নয়। আবার ধনী পরিবার থেকে এলেই কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন—এমনও নয়। একজন কর্মকর্তার আচরণ অনেকাংশে নির্ভর করে তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং ক্ষমতার পরিবেশে কাজ করছেন তার ওপর।
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই দুর্নীতি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর কী পরিবর্তন ঘটে?
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ে। বড় প্রকল্প, ক্রয়, নিয়োগ, নীতিনির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। যদি এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি দুর্বল থাকে, তাহলে অসাধু ব্যক্তিদের জন্য অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হলো—
- অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ;
- দুর্বল জবাবদিহি;
- শাস্তির অনিশ্চয়তা;
- রাজনৈতিক প্রভাব;
- দীর্ঘদিন একই ধরনের ক্ষমতাসীন অবস্থানে থাকা;
- সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কার্যকরভাবে যাচাই না হওয়া।
“ঘুষ দিয়ে চাকরি নিলে দুর্নীতি বেশি হয়”—এই ধারণা কি সবসময় সত্য?
সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, যারা ঘুষ দিয়ে চাকরি পান, তারাই পরে দুর্নীতি করে সেই অর্থ তুলে আনেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
যদি কোনো কর্মকর্তা সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে চাকরিতে প্রবেশ করেন, তবুও পরবর্তী সময়ে তিনি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। আবার অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘ কর্মজীবনেও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থাৎ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেটি একাই ভবিষ্যতের সততার নিশ্চয়তা দেয় না। কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারির ব্যবস্থা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন
দুর্নীতিকে শুধুমাত্র ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ একটি দুর্বল ব্যবস্থায় সৎ মানুষও চাপের মুখে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, আবার শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় অসৎ ব্যক্তি দুর্নীতি করার সুযোগ কম পান।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি কমাতে প্রয়োজন—
- সম্পদের নিয়মিত ও স্বাধীন যাচাই;
- সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা;
- স্বাধীন তদন্ত সংস্থার কার্যকর ভূমিকা;
- দুর্নীতির অভিযোগে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার;
- উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা;
- রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—উভয় স্তরেই সমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সব কর্মকর্তা সম্পর্কে একক সিদ্ধান্ত সঠিক নয়
দেশের প্রশাসনে হাজার হাজার বিসিএস কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা বিচারিক প্রক্রিয়া পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তাই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সম্পর্কে “বেশিরভাগই দুর্নীতিবাজ”—এ ধরনের সার্বিক মন্তব্য প্রমাণ ছাড়া করা যথার্থ নয়। বরং যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্ত বা আদালতের রায় রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দায় নির্ধারণ হওয়া উচিতউপসংহার
একজন মানুষের পারিবারিক পটভূমি তাঁর চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখলেও ক্ষমতা, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং শাস্তির নিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে তাঁর আচরণকে বেশি প্রভাবিত করে। ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর পথ হলো কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিকে দায়ী করা নয়; বরং এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে।



