প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী রেলযাত্রীদের জন্য সুখবর: টিকিটে মিলছে বড় ছাড়, কার্যকর হচ্ছে নতুন নিয়ম
বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবাকে আরও জনবান্ধব, সহজলভ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে ট্রেনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা টিকিটের মূল্যে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা পাবেন। প্রবীণদের জন্য ২৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য ট্রেনের শ্রেণীভেদে ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এই ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে।
গত ২৪ মে ২০২৬ (১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৬ শাখা থেকে জারি করা এক পরিপত্রের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় (সূত্র: ১.jpg)। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব দিপন দেবনাথ স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রটি গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখ থেকে দেশব্যাপী কার্যকর করা হয়েছে (সূত্র: ২.jpg)।
মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র (1.jpg ও 2.jpg) বিশ্লেষণ করে দুই শ্রেণির যাত্রীদের জন্য ছাড়ের নিয়মাবলী ও শর্তসমূহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. প্রবীণ নাগরিকদের (৬৫+ বছর) জন্য নিয়ম ও শর্তাবলী:
বয়স ও ভেরিফিকেশন: ছাড়ের সুবিধা পেতে যাত্রীর বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ৬৫ বছর বা তার বেশি হতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ডেটাবেজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বয়স যাচাই বা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হবে।
ছাড়ের পরিমাণ: প্রবীণ ব্যক্তিরা শুধুমাত্র ট্রেনের ‘ভিত্তি মূল্যের’ (Base Fare) ওপর ২৫% ছাড় পাবেন। তবে অন্যান্য আনুষঙ্গিক চার্জ (যেমন: সার্ভিস চার্জ, ভ্যাট ইত্যাদি) বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে।
টিকিট সংগ্রহের মাধ্যম: এই ছাড়ের সুবিধা অনলাইন (অ্যাপ/ওয়েবসাইট) এবং রেলস্টেশনের কাউন্টার—উভয় মাধ্যম থেকেই পাওয়া যাবে। তবে ব্যবহারকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশ রেলওয়ের সিস্টেমে নিবন্ধিত হতে হবে এবং NID ভেরিফিকেশন সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
কোটা ও ফ্রিকোয়েন্সি: একজন প্রবীণ ব্যক্তি প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২ (দুই) বার এই ২৫% ছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। সপ্তাহের হিসাবটি যাত্রার তারিখ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। যদি কোনো ডিসকাউন্টেড টিকিট রিফান্ড (ফেরত) করা হয়, তবে তা সাপ্তাহিক কোটার গণনা থেকে বাদ যাবে এবং যাত্রী ওই সপ্তাহে পুনরায় ছাড়ের টিকিট কেনার যোগ্যতা পাবেন।
সহযাত্রীর নিয়ম: প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কোনো সহযাত্রী থাকলে তার জন্য নিয়মিত ভাড়া প্রযোজ্য হবে। তবে সহযাত্রীও যদি ৬৫ ঊর্ধ্ব প্রবীণ হন, তবে প্রতি বুকিংয়ে সর্বোচ্চ আরও ১ (এক) জন অতিরিক্ত প্রবীণ সহযাত্রী এই ছাড় পাবেন। এক্ষেত্রে ওই সহযাত্রীকেও নিজস্ব নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে আলাদাভাবে ভেরিফাইড হতে হবে।
২. শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিয়ম ও শর্তাবলী:
যোগ্যতা: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘সুবর্ণ কার্ড’ বা সুবর্ণ পরিচয়পত্রধারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই কেবল এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবেন।
শ্রেণীভেদে ছাড়ের হার:
আন্তঃনগর ট্রেনের সুলভ/শোভন শ্রেণীতে এবং যেসব ট্রেনে সুলভ বা শোভন শ্রেণী নেই, সেসব ট্রেনের শোভন চেয়ার শ্রেণীর মোট ভাড়ার ওপর বিদ্যমান সুবিধা অনুযায়ী ৫০% (পঞ্চাশ শতাংশ) ছাড় দেওয়া হবে।
এছাড়া নতুন করে ট্রেনের সকল শীতাতপ (AC) শ্রেণীতে ২৫% (পঁচিশ শতাংশ) রেয়াত বা ছাড় প্রদান করা হবে।
প্রবীণদের মতোই ভিত্তি মূল্যের ওপর এই ছাড় কার্যকর হবে এবং অন্যান্য চার্জ (সার্ভিস চার্জ, ভ্যাট ইত্যাদি) আগের নিয়মেই প্রযোজ্য থাকবে।
টিকিট সংগ্রহের মাধ্যম: প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য এই ছাড়ের সুবিধা আপাতত শুধুমাত্র স্টেশন কাউন্টারে টিকিট ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বা কার্যক্রম সম্পাদন সাপেক্ষে পরিচয়পত্রধারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ইস্যুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সহযাত্রী: প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে ভ্রমণকারী সহযাত্রীর জন্য কোনো ছাড় থাকবে না, তার ক্ষেত্রে নিয়মিত ভাড়া প্রযোজ্য হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে এই পরিপত্রের অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে অবগতির জন্য পাঠানো হয়েছে। সরকারের এই কল্যাণমুখী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের রেলভ্রমণ আরও সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



