সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

নমিনি কি একাই পাবেন ব্যাংকের জমাকৃত টাকা? হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও ব্যাংকিং বিধান নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ

একজন হিন্দু ব্যক্তির দুটি বিবাহ ছিল। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর আগে তাদের সংসারে চার ছেলে জন্ম নেয়। পরে ওই ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় প্রথম পক্ষের চার ছেলেকে প্রত্যেককে ৫ বিঘা করে জমি লিখে দেন।

পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় পক্ষে দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। জীবদ্দশায় তিনি দুই মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য ব্যাংকে কিছু অর্থ জমা রাখেন এবং ওই ব্যাংক হিসাবের নমিনি হিসেবে দ্বিতীয় স্ত্রীকে মনোনীত করেন।

ব্যক্তির মৃত্যুর পর প্রথম পক্ষের চার ছেলে দাবি করেন, ব্যাংকে জমাকৃত অর্থেও তাদের উত্তরাধিকার রয়েছে। তারা এ বিষয়ে ব্যাংকে অভিযোগও করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—নমিনি কি একাই পুরো টাকা পাবেন, নাকি মৃত ব্যক্তির সকল আইনগত উত্তরাধিকারীর মধ্যে তা বণ্টিত হবে?

নমিনি হওয়ার অর্থ কী?

বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নমিনি (Nominee) হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি হিসাবধারীর মৃত্যুর পর ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণ করার অধিকার পান। তবে নমিনি হওয়া এবং প্রকৃত মালিক হওয়া—দুটি বিষয় এক নয়।

যদি হিসাবধারী জীবিত অবস্থায় আইনগতভাবে দান, ট্রাস্ট বা অন্য কোনো বৈধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর না করে থাকেন, তাহলে কেবল নমিনি হওয়ার কারণে তিনি সম্পদের চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান না। নমিনি অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের পক্ষে অর্থ গ্রহণকারী (receiver) হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কী হবে?

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কোনো হিন্দু ব্যক্তি উইল না করে মারা গেলে তার সম্পত্তি আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়।

অতএব, যদি ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ কেবল একটি সাধারণ সঞ্চয় হিসাবের আমানত হয় এবং মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় বৈধভাবে সেই অর্থ দ্বিতীয় স্ত্রীকে দান করে না থাকেন, তাহলে সেই অর্থ উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টনের প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে নমিনি অর্থ উত্তোলন করলেও অন্যান্য বৈধ উত্তরাধিকারী তাদের অংশ দাবি করার অধিকার রাখতে পারেন।

ব্যাংক কী করবে?

ব্যাংকের দায়িত্ব হলো ব্যাংকিং নথি অনুযায়ী নমিনির পরিচয় যাচাই করে অর্থ পরিশোধ করা। তবে যদি—

  • উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়,
  • লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে,
  • আদালতে মামলা চলমান থাকে, অথবা
  • ব্যাংকের কাছে মালিকানা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ সৃষ্টি হয়,

তাহলে ব্যাংক অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখতে পারে অথবা আদালতের নির্দেশ, উত্তরাধিকার সনদ, প্রবেট বা অন্যান্য আইনগত নথি দাখিলের নির্দেশ দিতে পারে।

অর্থাৎ অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নমিনিকে টাকা দিয়ে দিতে বাধ্য নয়।

প্রথম পক্ষের চার ছেলের দাবির আইনগত ভিত্তি

প্রথম পক্ষের চার ছেলে অতীতে ৫ বিঘা করে জমি পেয়েছেন—এটি সত্য হলেও, সেই জমি পাওয়া মানেই ভবিষ্যতে পিতার অন্য সম্পত্তির ওপর তাদের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।

যদি জমি প্রদানটি ছিল আলাদা দান এবং ব্যাংকের অর্থের বিষয়ে কোনো বৈধ দান বা মালিকানা হস্তান্তর না হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকের আমানতের ক্ষেত্রে তারা উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন। তবে সেই দাবির বৈধতা নির্ধারণ করবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও প্রয়োজন হলে আদালত।

নমিনি কি এককভাবে পুরো টাকা পাবেন?

“নমিনি একাই সব টাকা পাবেন, অন্য কেউ কোনোভাবেই পাবে না”—এমন বক্তব্য আইনগতভাবে সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।

নমিনি ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণের অধিকারী হতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত মালিকানা নির্ভর করবে—

  • মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় সম্পদের মালিকানা কীভাবে নির্ধারণ করেছিলেন,
  • হিসাবের ধরন,
  • দানপত্র বা অন্য কোনো বৈধ দলিল আছে কি না,
  • প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন, এবং
  • আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ থাকলে ব্যাংক সাধারণত একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত নথি বা আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে। এতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষের ক্ষতির আশঙ্কা কমে।

উপসংহার

ব্যাংক হিসাবের নমিনি থাকলেই তিনি সব সময় চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান—এমন ধারণা সঠিক নয়। বিশেষ করে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ব্যাংক বিষয়টি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। ফলে এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত আইনগত পরামর্শ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় নথি বা আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *