পে-স্কেল I গেজেট । প্রজ্ঞাপন । পরিপত্র

মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদিমের সম্মানি নির্ধারণ, থাকছে গ্রেডভিত্তিক বেতনের সুযোগ

দেশের মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো নির্ধারণ করেছে সরকার। ‘মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পেশ ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদিম, খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীদের সম্মানি, বেতন-ভাতা, নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।

নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—মডেল মসজিদের কর্মীদের জন্য একদিকে নির্দিষ্ট সম্মানির কাঠামো রাখা হয়েছে, অন্যদিকে যেসব মসজিদের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, সেসব মসজিদ কমিটিকে নির্ধারিত সরকারি গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

পেশ ইমাম পাবেন ২০ হাজার টাকা

নীতিমালা অনুযায়ী, মডেল মসজিদে কর্মরত পেশ ইমামকে মাসে ২০ হাজার টাকা সম্মানি দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ কাঠামোয় পেশ ইমামের জন্য মাসিক সম্মানির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০,০০০ টাকা।

তবে আর্থিকভাবে সক্ষম কোনো মডেল মসজিদ চাইলে সংশ্লিষ্ট পদে নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে পেশ ইমামের জন্য ১০ম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

মুয়াজ্জিনের সম্মানি ১৫ হাজার টাকা

নীতিমালায় মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিনের মাসিক সম্মানি ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা থাকা মসজিদ কমিটি নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দিতে পারবে।

গ্রেডভিত্তিক বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে মুয়াজ্জিনের জন্য ১৬তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

খাদিম পাবেন ১২ হাজার টাকা

মডেল মসজিদের খাদিমের মাসিক সম্মানি ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর্থিক সক্ষমতা থাকলে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটি নির্ধারিত সরকারি গ্রেড অনুযায়ী বেতন দেওয়ার সুযোগ পাবে।

এ ক্ষেত্রে খাদিমের জন্য ১৮তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীর সম্মানি চুক্তিভিত্তিক

নীতিমালায় খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক সম্মানি উল্লেখ না করে তাদের সম্মানি চুক্তিভিত্তিক নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এ দুই পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি চুক্তির মাধ্যমে সম্মানির পরিমাণ নির্ধারণ করবে।

একনজরে সম্মানি ও গ্রেড

পদমাসিক সম্মানিআর্থিক সক্ষমতা থাকলে গ্রেডভিত্তিক বেতন
পেশ ইমাম২০,০০০ টাকা১০ম গ্রেড
মুয়াজ্জিন১৫,০০০ টাকা১৬তম গ্রেড
খাদিম১২,০০০ টাকা১৮তম গ্রেড
খতিবচুক্তিভিত্তিকচুক্তিভিত্তিক
নিরাপত্তা প্রহরীচুক্তিভিত্তিকচুক্তিভিত্তিক

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ২০ হাজার, ১৫ হাজার ও ১২ হাজার টাকা হলো নীতিমালায় নির্ধারিত সম্মানির কাঠামো; এগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব মডেল মসজিদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের মূল বেতন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আর্থিক সক্ষমতা থাকা মসজিদে নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার আলাদা সুযোগ রয়েছে।

১০ বছর পূর্তিতে পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হওয়ার বিধান

উপস্থাপিত নীতিমালার ছকে একই পদে ১০ বছর পূর্তির পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। ফলে গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর আওতায় থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে এ বিষয়টি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদ, চাকরির ধারাবাহিকতা, নিয়োগের ধরন এবং নীতিমালার অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হবে—তাই এটিকে সব কর্মীর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য পদোন্নতি হিসেবে দেখা উচিত নয়।

শুধু বেতন নয়, মসজিদকে শিক্ষা ও জনসচেতনতার কেন্দ্র করার পরিকল্পনা

নতুন নীতিমালার পরিধি শুধু জনবল ও বেতন-ভাতায় সীমাবদ্ধ নয়। সরকার মডেল মসজিদগুলোকে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা, জনসচেতনতা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে।

এর আওতায় মডেল মসজিদে—

  • পবিত্র কোরআন শিক্ষা;
  • বয়স্কদের কোরআন শিক্ষা;
  • হিফজখানা;
  • শিশুদের মক্তব শিক্ষা;
  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ;
  • জুমার নামাজ;
  • ঈদের নামাজ;
  • জানাজার নামাজ;
  • প্রাক-খুতবা ও খুতবা;
  • রমজানে তারাবিহর ব্যবস্থা

চালু রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

রমজান মাসে তারাবিহ পড়ানোর জন্য যোগ্য হাফেজ নিয়োগ এবং প্রয়োজন হলে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।

সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে মডেল মসজিদ

নীতিমালায় মডেল মসজিদকে ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। শিরক, বিদআত, অপসংস্কৃতি, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস, পরিবেশ দূষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গুজব ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রাক-খুতবা ও খুতবার আয়োজনের কথা রয়েছে।

আয়-ব্যয়ের হিসাবেও কড়াকড়ি

মডেল মসজিদের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নতুন নীতিমালায় বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ, নগদ অর্থ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তদারকি, বার্ষিক বাজেট ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং হিসাব নিরীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া মসজিদের যাবতীয় আয় অনধিক সাত দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে মসজিদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

কর্মীদের দায়িত্ব ও আচরণবিধি

নীতিমালায় মডেল মসজিদে কর্মরত খতিবসহ জনবলকে মসজিদের আমানতদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিশ্বস্ততা, সততা, পরহেজগারি ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ না করার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

কেন এই নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ

নতুন কাঠামোর ফলে মডেল মসজিদের জনবল ব্যবস্থাপনায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হলো। আগে বিভিন্ন মসজিদে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর সম্মানি ও কর্মপরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করলেও নতুন নীতিমালা অন্তত একটি নির্ধারিত কাঠামো দিয়েছে।

বিশেষ করে পেশ ইমাম ২০ হাজার, মুয়াজ্জিন ১৫ হাজার এবং খাদিম ১২ হাজার টাকা সম্মানি—এই তিনটি অঙ্ক এখন মডেল মসজিদের কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা থাকা মসজিদে যথাক্রমে ১০ম, ১৬তম ও ১৮তম গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়ার সুযোগ থাকায় মসজিদভেদে বেতন কাঠামো আরও উন্নত করার পথও রাখা হয়েছে।

শেষ কথা

‘মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৬’ মূলত তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাঠামোবদ্ধ করেছে—জনবল ও সম্মানি, মসজিদের ধর্মীয়-শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। নতুন ব্যবস্থায় পেশ ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমের জন্য নির্দিষ্ট সম্মানি থাকলেও আর্থিকভাবে সক্ষম মডেল মসজিদে নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীর নিয়োগ ও সম্মানি চুক্তিভিত্তিক রাখার বিধান করা হয়েছে।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *