৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

অবসান হচ্ছে সংশয়ের: নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত থাকছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও

আসন্ন নতুন পে-কমিশন বা জাতীয় বেতন কাঠামো নিয়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে দীর্ঘদিনের যে সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, বিভিন্ন তথ্য ও রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে তার সম্পূর্ণ অবসান ঘটেছে। মূলত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দোলাচল থেকে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে এই সংশয়ের জন্ম হয়েছিল, যার একটি যৌক্তিক ভিত্তিও রয়েছে। তবে সরকারি আইনি প্রজ্ঞাপন এবং জাতীয় বাজেটের সুনির্দিষ্ট খতিয়ান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ২০১৫ সালের ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলের স্পষ্ট ঘোষণার পর থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজ স্থায়ীভাবে জাতীয় স্কেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, যখনই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জাতীয় বেতন স্কেলের পরিবর্তন কিংবা পরিমার্জন আসবে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন ও বাজেট বরাদ্দের অকাট্য প্রমাণ

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে নতুন বেতন কাঠামো ও বরাদ্দের একটি বিশাল তথ্যসূত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পদের ব্যবহার অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ বাবদ আগামী অর্থবছরের জন্য এক ঐতিহাসিক রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শুধুমাত্র এই জনপ্রশাসন খাতেই বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো অর্থ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই বর্ধিত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা থেকে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনধারী ব্যক্তিদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সরকারের এই বিশাল বাজেট বরাদ্দই প্রমাণ করে যে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আর্থিক হিস্যা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন ও আইনি বাধ্যবাধকতা

বেসরকারি শিক্ষকদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, ২০১৫ সালে যখন ৮ম জাতীয় বেতন স্কেল জারি করা হয়, তখন সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে—এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরাও এই জাতীয় স্কেলের আওতাভুক্ত থাকবেন। সেই প্রজ্ঞাপনের পর থেকেই তারা সরকারি স্কেলের সমপরিমাণ (১০০%) মূল বেতন বা বেসিক পেয়ে আসছেন।

নীতিগত ও আইনিভাবে নিয়ম হলো, যে মুহূর্তে কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় স্কেলের অংশ হয়ে যান, সেই স্কেলের পরবর্তী যেকোনো সংশোধন, পরিবর্ধন, মহার্ঘ ভাতা বা নতুন কাঠামো ঘোষণার সাথে সাথে তারা সমঅধিকার প্রাপ্ত হন। সুতরাং, নতুন পে-কমিশন বা বেতন কাঠামো হলে এমপিওভুক্তরা বাদ পড়বেন—এমন আশঙ্কা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অমূলক।

এক নজরে জনপ্রশাসন খাতের বাজেট ও বরাদ্দ (কোটি টাকায়):

  • চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর (সংশোধিত বাজেট): ৮৬,৮৬২ কোটি টাকা

  • আসন্ন নতুন অর্থবছর (প্রস্তাবিত বাজেট): ১,৪১,৪৩৪ কোটি টাকা

  • মোট বরাদ্দ বৃদ্ধি: ৫৪,৫৭২ কোটি টাকা

  • নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সংরক্ষিত বরাদ্দ: কমপক্ষে ৪৪,০০০ কোটি টাকা (সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের আংশিক বাস্তবায়নে)

কেন এই সংশয় এবং এর যৌক্তিকতা?

শিক্ষক সমাজের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—যদি সবকিছু আইনানুযায়ী নির্ধারিতই থাকে, তবে কেন বারবার এই সংশয় তৈরি হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের দীর্ঘদিনের কিছু বাস্তব অপ্রাপ্তির মধ্যে। পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা না পাওয়া, নামমাত্র বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার মতো দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের কারণে শিক্ষকদের মনে এক ধরনের স্বাভাবিক অবিশ্বাস বা সংশয়ের জন্ম নেয়। এই সংশয়কে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, এর যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু যখনই রাষ্ট্রের সামষ্টিক বাজেট, অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা এবং আইনি কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া যায়, তখন পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, রাষ্ট্র নতুন কোনো বেতন স্কেল বা বিশেষ সুবিধা দিলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই এমপিওভুক্তদের বঞ্চিত করে তা করা সম্ভব নয়।

শেষ কথা: আশার আলো

সর্বোপরি বলা যায়, উপস্থাপিত অর্থ বিভাগের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য এবং ২০১৫ সালের প্রজ্ঞাপনের আইনি সুরক্ষাকবচ—দুই-ই প্রমাণ করে যে, দেশের ৫ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর ভাগ্য জাতীয় স্কেলের পরিবর্তনের সাথেই অবিচ্ছেদ্যভাবে বাঁধা। তাই সব ধরনের অপপ্রচার ও ধোঁয়াশা পেছনে ফেলে শিক্ষকদের এখন ইতিবাচক থাকা প্রয়োজন। জাতীয় স্কেলের যেকোনো পরিবর্তনই হবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও আর্থিক মুক্তির নতুন ধাপ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *