সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

এমপি-মন্ত্রীদের বেতন-ভাতা কত, এত কম বেতনে জনদাবির চাপ সামলাবেন কীভাবে?

একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা। একজন মন্ত্রী পান ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রী ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। তবে পদগুলোর সঙ্গে থাকা বিভিন্ন ভাতা, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যোগ করলে শুধু মূল বেতনের হিসাব দিয়ে তাঁদের আর্থিক সুবিধার পুরো চিত্র বোঝা যায় না।

এদিকে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় মানুষের প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত সহায়তার চাপ নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা, দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ে, শিক্ষার্থীদের সহায়তা কিংবা স্থানীয় যুবসমাজের খেলাধুলার আয়োজন—এসব সামাজিক ও ব্যক্তিগত আবেদনে অনেক সময় এমপিদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থসহায়তা প্রত্যাশা করা হয়।

সম্প্রতি এমনই বাস্তবতার কথা তুলে ধরে একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে—একজন এমপি তাঁর নির্ধারিত বেতন-ভাতা থেকে এসব সামাজিক প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন? বক্তব্যে বলা হয়, এলাকায় গেলে কেউ চিকিৎসার জন্য সহায়তা চান, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য সহযোগিতা চান, আবার তরুণরা খেলাধুলার আয়োজন করে পুরস্কার হিসেবে মোটরসাইকেল পর্যন্ত চান। এ ধরনের প্রত্যাশা পূরণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়।

বক্তব্যে আরও বলা হয়, যাঁদের নিজস্ব অর্থ-সম্পদ রয়েছে তাঁরা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে এসব সহায়তা করতে পারেন; কিন্তু সাধারণ আর্থিক সামর্থ্যের একজন এমপির পক্ষে নিয়মিতভাবে এ ধরনের ব্যয় বহন করা কঠিন। এ কারণে জনপ্রতিনিধিদের বেতন-ভাতা ও দায়িত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন কি না—সেটিও আলোচনায় এসেছে।

এমপির মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য মাসে ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এ বেতনের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকা ভাতা ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং আপ্যায়ন ভাতা ৫ হাজার টাকা রয়েছে। পরিবহন বাবদ মাসে ৭০ হাজার টাকা এবং নির্বাচনী এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা লন্ড্রি ভাতা এবং ৬ হাজার টাকা বিবিধ ব্যয় ভাতা রয়েছে। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির সভায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত দৈনিক ও যাতায়াত ভাতা পাওয়া যায়।

তবে এসব ভাতার সবগুলোকে এমপির ব্যক্তিগত আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়—যেমন পরিবহন, অফিস পরিচালনা ও নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াতের খরচ মেটানোর জন্য নির্ধারিত।

এমপির আরও যেসব সুবিধা রয়েছে

আইন ও প্রচলিত বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পান। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন;
  • মাসিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনী এলাকা ভাতা;
  • মাসিক ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা;
  • মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা;
  • নির্বাচনী এলাকার অফিস পরিচালনায় মাসে ১৫ হাজার টাকা;
  • মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা লন্ড্রি ভাতা;
  • মাসিক ৬ হাজার টাকা বিবিধ ব্যয় ভাতা;
  • অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত সুবিধা;
  • চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের সুবিধা;
  • নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক-করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা;
  • নির্ধারিত বিমা সুবিধা।

এ ছাড়া মসজিদ ও মন্দির উন্নয়নের জন্য বছরে ৫ লাখ টাকা এবং বাসার টেলিফোন বিল বাবদ মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, ৫৫ হাজার টাকা হলো মূল বেতন; এমপির মোট সরকারি সুবিধা শুধু এই অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। তবে পরিবহন, অফিস, ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতের ভাতা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যয়ের জন্য দেওয়া হয়।

মন্ত্রীর বেতন ১ লাখ ৫ হাজার, প্রতিমন্ত্রী ৯২ হাজার

‘The Ministers, Ministers of State and Deputy Ministers (Remuneration and Privileges) Act, 1973’-এ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কাঠামো নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে একজন মন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রীর ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীর ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। আইন অনুযায়ী এসব বেতন করমুক্ত।

মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বেতনের বাইরে বিভিন্ন সরকারি সুবিধাও পান। দায়িত্ব অনুযায়ী সরকারি বাসভবন, গাড়ি, কর্মচারী, নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং সফরসংক্রান্ত সুবিধা রয়েছে। সরকারি বাসভবনে থাকলে বাসার রক্ষণাবেক্ষণ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোনসহ নির্দিষ্ট খরচ সরকার বহন করে।

সরকারি বাসভবনে না থাকলে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। মন্ত্রীর ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার পরিমাণ ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে বলে প্রচলিত বিধানে উল্লেখ আছে।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের চিকিৎসা সুবিধাও রয়েছে

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধাও পান। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্য অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করে।

এ ছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর জন্য ব্যক্তিগত স্টাফ, সরকারি বাসভবন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো সুবিধাও আইনে নির্ধারিত রয়েছে।

তাহলে এমপির বেতন বাড়ানোর দাবি কেন?

এখানেই মূল বিতর্ক। সংসদ সদস্যের মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা হলেও একজন জনপ্রতিনিধির সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের পরিধি অনেক বড়। নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ থাকে। অনেক ভোটার মনে করেন, তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যক্তিগত বিপদে পাশে দাঁড়াবেন।

চিকিৎসার জন্য অর্থ, দরিদ্র পরিবারের বিয়ের খরচ, শিক্ষা সহায়তা, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা স্থানীয় সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে এমপির ব্যক্তিগত সহায়তা প্রত্যাশা করা অনেক এলাকায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্র একজন এমপিকে দায়িত্ব পালনের জন্য যে অর্থ ও ভাতা দেয়, তার সবটাই ব্যক্তিগত অনুদান দেওয়ার জন্য নয়। পরিবহন ভাতা গাড়ি, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের খরচের সঙ্গে যুক্ত; অফিস ভাতা নির্বাচনী এলাকার অফিস পরিচালনার জন্য; ভ্রমণ ভাতা দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ফলে এসব অর্থকে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের মধ্যে বিতরণযোগ্য ‘সহায়তা তহবিল’ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ সীমিত।

সহায়তার চাপ কি এমপিকে অনিয়মের দিকে ঠেলে দিতে পারে?

বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই। যখন একজন জনপ্রতিনিধির ওপর ব্যক্তিগত সহায়তার সামাজিক চাপ তৈরি হয়, কিন্তু সেই চাপ মোকাবিলার জন্য স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল থাকে না, তখন ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহার অথবা অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে জনপ্রতিনিধিদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি উঠলে সেটিকে শুধু ‘নিজেদের বেতন বাড়ানোর দাবি’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করা জরুরি যে, জনপ্রতিনিধিদের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হবে, তা যেন স্বচ্ছ, নিরীক্ষাযোগ্য এবং নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় থাকে।

অর্থাৎ, এমপির ব্যক্তিগত বেতন বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। বরং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা ও স্থানীয় ক্রীড়া-সংস্কৃতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি তহবিল শক্তিশালী করা হলে জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

বেতন বনাম দায়িত্ব—বিতর্কের জায়গা এখানেই

২০১৬ সালে এমপিদের বেতন ২৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৫ হাজার টাকা করা হয়েছিল। একই সময়ে পরিবহনসহ বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানো হয়। সে সময় জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি কর্মচারীদের অষ্টম পে-স্কেলের বিষয় বিবেচনায় রেখে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

এরপর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে।

তাই বর্তমানে প্রশ্নটি শুধু ‘এমপি কত টাকা বেতন পান?’—এখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বড় প্রশ্ন হচ্ছে, একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের প্রকৃত ব্যয় কত এবং সেই ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কতটা বাস্তবসম্মত?

একদিকে এমপিদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন; অন্যদিকে নির্বাচনী এলাকায় মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, সামাজিক ও মানবিক সহায়তার চাপও উপেক্ষা করা যায় না।

সুতরাং, জনপ্রতিনিধিদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের আলোচনা হলে সেটি বেতন বৃদ্ধির রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে না রেখে—দায়িত্ব, ব্যয়, সামাজিক প্রত্যাশা, সরকারি সুবিধা এবং জবাবদিহির সমন্বিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান আইনি কাঠামোয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এমপিদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার বড় অংশ নির্ধারিত হলেও নির্বাচনী এলাকার ব্যক্তিগত মানবিক সহায়তার জন্য এমপিদের হাতে আলাদা, সীমাহীন ব্যক্তিগত তহবিল নেই। ফলে ‘এলাকার মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে এমপি কোথা থেকে অর্থ দেবেন’—এই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত সামর্থ্যের চেয়ে বেশি করে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *