কারাগারে ডেপুটি জেলার ও তদনিম্ন কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ, বয়সভেদে সর্বোচ্চ ৫,৫২০ টাকা
কারাগারে কর্মরত ডেপুটি জেলার ও তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য মাসিক ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এ সংক্রান্ত নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় একই পদে কর্মরত হলেও চাকরির বয়স অনুযায়ী ঝুঁকি ভাতার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়বে।
প্রকাশিত গেজেটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এই আদেশ কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের জন্য কারাগারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরির বয়স অনুযায়ী সারণিতে উল্লেখিত মাসিক ঝুঁকি ভাতা পাবেন।
যেসব পদে নতুন ঝুঁকি ভাতা
প্রকাশিত সারণিতে কারারক্ষী/মহিলা কারারক্ষী/দেহরক্ষী থেকে শুরু করে ডেপুটি জেলার পর্যন্ত মোট ছয়টি পর্যায়ের পদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো—
- কারারক্ষী/মহিলা কারারক্ষী/দেহরক্ষী — গ্রেড-১৭
- সহকারী প্রধান কারারক্ষী — গ্রেড-১৬
- প্রধান কারারক্ষী/মেট্রন — গ্রেড-১৫
- সর্ব প্রধান কারারক্ষী — গ্রেড-১৪
- সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর — গ্রেড-১৩
- ডেপুটি জেলার — গ্রেড-১১
অর্থাৎ এটি শুধু ডেপুটি জেলারদের জন্য নয়; সারণিতে নির্ধারিত কারা বিভাগের তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীরাও নতুন হারে ঝুঁকি ভাতা পাবেন।
পদ ও চাকরির বয়স অনুযায়ী ঝুঁকি ভাতার পূর্ণ তালিকা
| পদ | গ্রেড | ৫ বছরের কম | ৫+ থেকে ১০ বছর | ১০+ থেকে ১৫ বছর | ১৫+ থেকে ২০ বছর | ২০+ বছর |
|---|---|---|---|---|---|---|
| কারারক্ষী/মহিলা কারারক্ষী/দেহরক্ষী | ১৭ | ১,৮০০ | ২,১৬০ | ২,৬৮০ | ৩,০০০ | ৩,৬০০ |
| সহকারী প্রধান কারারক্ষী | ১৬ | ১,৯২০ | ২,২৮০ | ২,৭৬০ | ৩,২৪০ | ৩,৮৪০ |
| প্রধান কারারক্ষী/মেট্রন | ১৫ | ২,০৪০ | ২,৪০০ | ২,৮৮০ | ৩,৪৬০ | ৪,০৮০ |
| সর্ব প্রধান কারারক্ষী | ১৪ | ২,১৬০ | ২,৬৪০ | ৩,২৪০ | ৩,৮৪০ | ৪,৫৬০ |
| সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর | ১৩ | ২,২৮০ | ২,৭৬০ | ৩,৩৬০ | ৪,০৮০ | ৪,৮০০ |
| ডেপুটি জেলার | ১১ | ২,৬৪০ | ৩,২৪০ | ৩,৮৪০ | ৪,৫৬০ | ৫,৫২০ |
ডেপুটি জেলারদের ক্ষেত্রে
ডেপুটি জেলার পদটি সারণির সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ পদে—
৫ বছরের কম চাকরি: ২,৬৪০ টাকা
৫ থেকে ১০ বছরের কম: ৩,২৪০ টাকা
১০ থেকে ১৫ বছরের কম: ৩,৮৪০ টাকা
১৫ থেকে ২০ বছরের কম: ৪,৫৬০ টাকা
২০ বছর বা তার বেশি: ৫,৫২০ টাকা
অর্থাৎ ২০ বছর বা তার বেশি চাকরির বয়স সম্পন্ন একজন ডেপুটি জেলার মাসে ৫,৫২০ টাকা ঝুঁকি ভাতা পাবেন।
চাকরির বয়সের সঙ্গে বাড়বে ভাতা
নতুন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঝুঁকি ভাতাকে শুধু পদ বা গ্রেডের ভিত্তিতে স্থির রাখা হয়নি। চাকরির বয়সকেও ভাতা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, গ্রেড-১৭-এর একজন কারারক্ষী ৫ বছরের কম চাকরিতে ১,৮০০ টাকা পেলেও ২০ বছর বা তার বেশি চাকরির ক্ষেত্রে পাবেন ৩,৬০০ টাকা। একইভাবে গ্রেড-১১-এর ডেপুটি জেলার ৫ বছরের কম চাকরিতে ২,৬৪০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ বছর বা তার বেশি চাকরিতে ৫,৫২০ টাকা পাবেন।
ফলে একই পদে কর্মরত দুই কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ভিন্ন হলে তাঁদের ঝুঁকি ভাতার পরিমাণও ভিন্ন হবে।
মূল বেতনের শতাংশ হিসেবে নয়
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঝুঁকি ভাতা মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং অর্থ বিভাগ নির্ধারিত সারণি অনুযায়ী নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে মাসিক ভাতা দেওয়া হবে।
জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর অধীনে ঝুঁকি ভাতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক অর্থ বিভাগের আদেশ প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়টিও সরকারি নির্দেশনায় রাখা হয়েছে। নতুন পে-স্কেলের গেজেটেও কারাগারসহ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ভাতার জন্য অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট আদেশগুলো অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর
গেজেটে দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, পুনর্নির্ধারিত ঝুঁকি ভাতার আদেশটি ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রাপ্যতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ এটি শুধু গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে নতুন সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; আদেশে নির্ধারিত কার্যকর তারিখও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রেষণে কর্মরতদের জন্য বিশেষ শর্ত
গেজেটের শর্তে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মচারীদের বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কর্মচারী প্রেষণে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ভাতা গ্রহণ করলে নিজ নিজ বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত ঝুঁকি ভাতা, বিশেষ ভাতা অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা একই সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবেন না।
অর্থাৎ একই সময়ে একই ধরনের একাধিক বিশেষ সুবিধা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি।
নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে কী সম্পর্ক?
২০২৬ সালের নতুন জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের পর বিভিন্ন বিশেষ ও ঝুঁকি ভাতার কাঠামো আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকাশিত পে-স্কেল গেজেটে কারাগারে কর্মরত ডেপুটি জেলার ও তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতার ক্ষেত্রে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অর্থ বিভাগের জারি করা সংশ্লিষ্ট আদেশগুলো প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের সাধারণ ভাতা কাঠামোর সঙ্গে এই ঝুঁকি ভাতাকে সরাসরি মিশিয়ে দেখার সুযোগ নেই। এটি সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী কর্মচারীদের জন্য পৃথকভাবে নির্ধারিত সুবিধা।
কেন এই ভাতা গুরুত্বপূর্ণ
কারাগারে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বের সঙ্গে বন্দী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, কারাগারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয় জড়িত। অতীতে কারা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের পক্ষ থেকে ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধির দাবিও উত্থাপিত হয়েছিল।
নতুন সারণিতে পদ ও চাকরির বয়স—দুই বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়ায় দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মচারীদের জন্য ভাতার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ধারিত হয়েছে।
হিসাবের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে
কোনো কর্মচারী কত টাকা ঝুঁকি ভাতা পাবেন তা নির্ধারণের সময় শুধু তাঁর গ্রেড দেখলেই হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে—
১. পদটি গেজেটের সারণিতে অন্তর্ভুক্ত কি না
২. সংশ্লিষ্ট গ্রেড
৩. চাকরির বয়স কত বছর পূর্ণ হয়েছে
৪. তিনি নিয়মিত পদে নাকি প্রেষণে কর্মরত
৫. সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর অর্থ বিভাগের আদেশ
বিশেষ করে চাকরির বয়সের ক্ষেত্রে ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছরের সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি ধাপ অতিক্রমের সঙ্গে মাসিক ঝুঁকি ভাতার পরিমাণ পরিবর্তিত হবে।
সারসংক্ষেপ
কারাগারে কর্মরত ডেপুটি জেলার ও তদনিম্ন পর্যায়ের নির্ধারিত পদগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি ভাতা কাঠামোয় মাসিক ১,৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫,৫২০ টাকা পর্যন্ত ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ডেপুটি জেলারদের জন্য সর্বনিম্ন হার ২,৬৪০ টাকা এবং ২০ বছর বা তার বেশি চাকরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫,৫২০ টাকা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভাতা মূল বেতনের শতাংশ নয়; নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে এবং চাকরির বয়সভেদে নির্ধারিত। আদেশটি ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত প্রযোজ্য বলে গেজেটে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর গেজেটেও কারাগারের নির্দিষ্ট কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের আদেশ অনুসরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।


