৪ হাজার ৫৮০ ইউপিতে নির্বাচন, ৭ ধাপে ভোটের সম্ভাব্য দিনক্ষণ জানাল ইসি
দেশের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সারাদেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর ২০২৬ প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে ইউপি নির্বাচন। এরপর ধাপে ধাপে ভোট চলবে ২০২৭ সালের ২৭ মে পর্যন্ত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে সম্ভাব্য সময়সূচির তথ্য তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তবে ইসি জানিয়েছে, এগুলো এখনো প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত সম্ভাব্য তারিখ। আন্তঃবিভাগীয় বৈঠক ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে ভোটের চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।
সাত ধাপে হতে পারে ইউপি নির্বাচন
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ধাপ ও তারিখ হলো—
| ধাপ | সম্ভাব্য ভোটের তারিখ |
|---|---|
| প্রথম ধাপ | ১২ নভেম্বর ২০২৬ |
| দ্বিতীয় ধাপ | ১৩ ডিসেম্বর ২০২৬ |
| তৃতীয় ধাপ | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৬ |
| চতুর্থ ধাপ | ১৭ জানুয়ারি ২০২৭ |
| পঞ্চম ধাপ | ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ |
| ষষ্ঠ ধাপ | ২২ এপ্রিল ২০২৭ |
| সপ্তম ধাপ | ২৭ মে ২০২৭ |
প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য ইউনিয়নকে ভোটের আওতায় আনা হবে।
১২ নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা
ইসির পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১২ নভেম্বর ২০২৬ প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নভেম্বর থেকেই শুরু হতে পারে দীর্ঘদিন পর ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক বড় স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নভেম্বর মাসকে সামনে রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল। কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছিলেন, নভেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি চলছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই তা শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
কেন সাত ধাপে ভোট?
দেশের হাজার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে একসঙ্গে ভোট আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ। তাই ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোটকেন্দ্র, নির্বাচন কর্মকর্তা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া পরীক্ষা, দুর্গাপূজা, রমজান ও ঈদের সময় বিবেচনায় নিয়েই ধাপগুলো সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে ইসি জানিয়েছে।
ইউপি নির্বাচন আয়োজনের জন্য নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়কে উপযুক্ত নির্বাচনকাল হিসেবে বিবেচনা করার কথাও আগেই জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। তবে ধর্মীয় উৎসব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময় বাদ দিয়ে ভোটের পরিকল্পনা করার কথা বলা হয়েছিল।
প্রথম ধাপে ৮০ উপজেলা
প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার অধীন ইউনিয়ন পরিষদে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপের আওতায় ৬৩ জেলার ইউনিয়নগুলো রাখা হলেও ঠাকুরগাঁওকে বাদ রাখা হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই আরও ইউনিয়নে ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। চতুর্থ ধাপ থেকে ভোট চলে যাবে ২০২৭ সালে। এভাবে শেষ ধাপে ২৭ মে ভোটের মাধ্যমে সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এখনো চূড়ান্ত নয় ভোটের তারিখ
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—প্রকাশিত তারিখগুলোকে এখনই চূড়ান্ত নির্বাচনী তফসিল হিসেবে দেখা যাবে না।
ইসি জানিয়েছে, সাত ধাপের এই পরিকল্পনা প্রাথমিক। পরবর্তী আন্তঃবিভাগীয় বৈঠকসহ প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করলে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ এবং প্রচারণার নির্দিষ্ট সময় জানা যাবে।
অর্থাৎ, ১২ নভেম্বর, ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে—এই তারিখগুলো বর্তমানে সম্ভাব্য ভোটের দিন; আনুষ্ঠানিক তফসিলের আগে এগুলো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু
ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কাঠামো অনুযায়ী আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন কার্যালয়গুলো মাঠপর্যায়ের নির্বাচন কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬ গেজেট প্রকাশ করেছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে নতুন আচরণবিধির গেজেটসহ ইউপি নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে শুধু ভোটের তারিখ নির্ধারণ নয়, নির্বাচন পরিচালনার আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
আগের ইউপি নির্বাচনের সঙ্গে পার্থক্য
সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল কয়েক ধাপে। ২০২১ সালের এপ্রিল, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন ধাপে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারও কমিশন একসঙ্গে সব ইউনিয়নে ভোট না করে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পথেই এগোচ্ছে।
এর ফলে প্রার্থীদের জন্যও ধাপভিত্তিক প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হবে। কোনো ইউনিয়নের ভোট আগে হলে সেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়ন, প্রচারণা ও ভোটকেন্দ্রকেন্দ্রিক প্রস্তুতিও আগে শুরু হবে। অন্যদিকে পরবর্তী ধাপের প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পাবেন।
সামনে কী হতে পারে
ইসির বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী নভেম্বর থেকেই দেশের স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হবে। ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূল স্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রাম পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সবকিছুর আগে এখন নজর থাকবে চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণার দিকে। তফসিল প্রকাশের পরই কোন ধাপে কোন ইউনিয়নে ভোট হবে, মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের তারিখসহ পুরো নির্বাচনী রোডম্যাপ স্পষ্ট হবে।
সার্বিকভাবে, ইসির বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সাত ধাপে অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রথম ভোট ১২ নভেম্বর ২০২৬ এবং শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে ২০২৭ করার প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক তফসিল না হওয়া পর্যন্ত এসব তারিখকে সম্ভাব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।



