দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ, চাকরির বয়স ও গ্রেডভেদে নতুন হার
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর গ্রেড-১০ ও তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য চাকরির বয়স ও গ্রেডভিত্তিক মাসিক ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনটির তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
নতুন প্রজ্ঞাপনে কর্মচারীদের জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী গ্রেড এবং একই সঙ্গে চাকরির বয়সের বিভিন্ন ধাপ বিবেচনায় নিয়ে মাসিক ঝুঁকি ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একই গ্রেডের কর্মচারী হলেও চাকরির মেয়াদ ভিন্ন হলে প্রাপ্য ঝুঁকি ভাতার পরিমাণও ভিন্ন হবে।
পাঁচটি চাকরির বয়সের ধাপে ঝুঁকি ভাতা
প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণে শুধু কর্মচারীর গ্রেড নয়, চাকরিতে তাঁর মোট বয়সকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য চাকরির বয়সকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে—
- চাকরির বয়স ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব নয়
- ৫ বছরের বেশি থেকে ১০ বছর
- ১০ বছরের বেশি থেকে ১৫ বছর
- ১৫ বছরের বেশি থেকে ২০ বছর
- ২০ বছরের বেশি অর্থাৎ পূর্ণ চাকরিজীবন
অর্থাৎ, একজন কর্মচারী একই গ্রেডে থাকলেও চাকরির বয়সের স্তর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাসিক ঝুঁকি ভাতার হারও পরিবর্তিত হবে। প্রজ্ঞাপনের দুই পৃষ্ঠার সারণিতে গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত পৃথক হার উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-১৪ পর্যন্ত হার
প্রজ্ঞাপনের প্রথম পৃষ্ঠায় গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-১৪ পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য চাকরির বয়সভেদে ঝুঁকি ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সারণিতে দেখা যায়, সাধারণভাবে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ঝুঁকি ভাতার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে এবং চাকরির বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে বিভিন্ন ধাপে ভাতার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি সাধারণ কোনো সব সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য ঝুঁকি ভাতা নয়; প্রজ্ঞাপনটি দুর্নীতি দমন কমিশনের গ্রেড-১০ ও তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য জারি করা হয়েছে।
গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্তও নির্ধারিত হার
প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য পৃথক ঝুঁকি ভাতার হার দেওয়া হয়েছে। চাকরির বয়স পাঁচটি ধাপে ভাগ করে প্রতিটি গ্রেডের জন্য আলাদা মাসিক অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সারণি অনুযায়ী গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত চাকরির বয়স বাড়ার সঙ্গে ভাতার পরিমাণও ধাপে ধাপে বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে, গ্রেড-২০-এর ক্ষেত্রে পাঁচটি বয়সধাপে মাসিক ঝুঁকি ভাতার হার যথাক্রমে ১,৪৪০ টাকা, ১,৮০০ টাকা, ২,১৬০ টাকা, ২,৬৪০ টাকা এবং ৩,১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রেড-১৯-এর ক্ষেত্রে হার ১,৫৬০ টাকা থেকে শুরু হয়ে চাকরির বয়স ২০ বছরের বেশি হলে ৩,২৪০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। গ্রেড-১৮-এ প্রথম ধাপে ১,৬৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বয়সধাপে ৩,৩৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই ধারায় গ্রেড-১৭, ১৬ ও ১৫-এর ক্ষেত্রেও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।
গ্রেড-১৫ থেকে ২০-এর ঝুঁকি ভাতার সারণি
| গ্রেড | ৫ বছর পর্যন্ত | ৫+–১০ বছর | ১০+–১৫ বছর | ১৫+–২০ বছর | ২০ বছরের বেশি |
|---|---|---|---|---|---|
| গ্রেড-১৫ | ২,০৪০ | ২,৪০০ | ২,৮৮০ | ৩,৪৮০ | ৪,০৮০ |
| গ্রেড-১৬ | ১,৯২০ | ২,২৮০ | ২,৭৬০ | ৩,২৪০ | ৩,৮৪০ |
| গ্রেড-১৭ | ১,৮০০ | ২,১৬০ | ২,৬৪০ | ৩,০০০ | ৩,৬০০ |
| গ্রেড-১৮ | ১,৬৮০ | ২,০৪০ | ২,৪০০ | ২,৮৮০ | ৩,৩৬০ |
| গ্রেড-১৯ | ১,৫৬০ | ১,৯২০ | ২,২৮০ | ২,৭৬০ | ৩,২৪০ |
| গ্রেড-২০ | ১,৪৪০ | ১,৮০০ | ২,১৬০ | ২,৬৪০ | ৩,১২০ |
উপরের হারগুলো প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠার সারণি থেকে নেওয়া।
১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর
নতুন ঝুঁকি ভাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কার্যকারিতার তারিখ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে আদেশটি কার্যকর হবে এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ তারিখ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
অর্থাৎ, এটি শুধু ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত কোনো সুবিধা নয়; প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত কার্যকারিতা অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরু থেকেই এর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে অন্য নির্দিষ্ট ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত
প্রজ্ঞাপনে ঝুঁকি ভাতার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নিয়োজিত কর্মচারীরা ঝুঁকি ভাতা গ্রহণ করলে স্ব-স্ব বাহিনীর জন্য নির্ধারিত ঝুঁকি ভাতা বা বিশেষ ভাতা কিংবা প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) প্রাপ্য হবেন না।
অর্থাৎ, একই ধরনের ঝুঁকির জন্য একাধিক নির্ধারিত সুবিধা একসঙ্গে গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। কোন কর্মচারী কোন ভাতা পাবেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
দুদকের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সরাসরি ঝুঁকি ও দায়িত্বের বিষয়টি যুক্ত। নতুন কাঠামোতে সেই ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে—কর্মচারীর গ্রেড এবং চাকরির বয়স।
এর ফলে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই কর্মচারীর গ্রেড একই হলেও তাঁদের চাকরির মেয়াদ আলাদা হলে ঝুঁকি ভাতার পরিমাণও আলাদা হতে পারে। আবার একই চাকরির বয়স হলেও গ্রেডের পার্থক্যের কারণে ভাতার হার ভিন্ন হবে।
এ ধরনের কাঠামো মূলত চাকরির অভিজ্ঞতা ও পদভিত্তিক পার্থক্যকে ভাতা নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
গেজেটে প্রকাশিত হওয়ায় এখন কী জানা গেল
এ সিদ্ধান্তটি আর কেবল প্রস্তাব বা আলোচনার পর্যায়ে নেই। বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট গ্রেডগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ, কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং ভাতা গ্রহণের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ভাতা নির্ধারণে এখন মূল বিবেচ্য হবে তাঁদের জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর গ্রেড, চাকরির বয়স এবং প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্ত।
সারসংক্ষেপ
নতুন ব্যবস্থায়—
গ্রেড + চাকরির বয়স = নির্ধারিত মাসিক ঝুঁকি ভাতা
এই কাঠামোর আওতায় গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য পাঁচটি চাকরির বয়সের ধাপে ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। আদেশটি ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর এবং প্রজ্ঞাপনে এর মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট অন্যান্য ঝুঁকি/বিশেষ/প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা গ্রহণের বিষয়ে বিধিনিষেধও রাখা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: এই প্রজ্ঞাপনটি দুর্নীতি দমন কমিশনের গ্রেড-১০ ও তদনিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য; তাই এটিকে সব সরকারি কর্মচারীর জন্য সাধারণ ঝুঁকি ভাতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।



