নবম পে-স্কেলের গেজেট ভেটিংয়ে, ফিক্সেশন কয় ধাপে হবে—এখনও কাটেনি জটিলতা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গেজেটের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পে ফিক্সেশন এক ধাপে হবে, নাকি ধাপে ধাপে করা হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের আশা, ভেটিংসহ বাকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশকে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গেজেট ভেটিংয়ে, নজর এখন ফিক্সেশন পদ্ধতিতে
নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের আগে খসড়া প্রজ্ঞাপনের আইনগত দিক যাচাই করা হচ্ছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পথ আরও পরিষ্কার হবে।
তবে গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামনে আসবে—লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা।
কারণ নতুন বেতন কাঠামো যদি একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হয়, তাহলে প্রত্যেক কর্মচারীর বিদ্যমান বেতন, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডসহ প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিত্তিতে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা তুলনামূলকভাবে সরল হবে।
অন্যদিকে, যদি মূল বেতন বা বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ আগে এবং বাকি অংশ পরে কার্যকর করা হয়, তাহলে একই কর্মচারীর বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় বাড়তি প্রস্তুতি দরকার হবে।
অনলাইন পে ফিক্সেশনেই থাকবে পুরো হিসাব
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের বড় অংশই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। সরকারি হিসাব ব্যবস্থায় অনলাইন পে/পেনশন ফিক্সেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও কর্মচারীর বিভিন্ন তথ্য সিস্টেমে সংযুক্ত করে বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
এক্ষেত্রে সাধারণভাবে যেসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কর্মচারীর পদ ও পদমর্যাদা;
- বর্তমান গ্রেড;
- বর্তমান মূল বেতন;
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ;
- সর্বশেষ বেতন নির্ধারণের তথ্য;
- বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট;
- পদোন্নতির তথ্য;
- উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির তথ্য;
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য;
- প্রযোজ্য অন্যান্য সার্ভিস-সংক্রান্ত তথ্য।
এসব তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর নিয়ম অনুযায়ী সফটওয়্যারেই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। পে ফিক্সেশন বলতে মূলত নতুন বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট বা উচ্চতর গ্রেডের মতো পরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন মূল বেতন নির্ধারণকে বোঝায়।
আইবাস++ নিয়ে যে প্রশ্ন, তার উত্তর কোথায়?
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে iBAS++ কতটা প্রস্তুত—এটি এখন সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
একটি পক্ষের যুক্তি হলো, আইবাস++ যেহেতু সরকারি কর্মচারীদের বেতন, বিল ও আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিয়ম ও ফর্মুলা সফটওয়্যারে সংযোজন করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলের কাঠামো সফটওয়্যারে ইনপুট করা, কর্মচারীর তথ্য যাচাই করা এবং নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী হিসাব করার ব্যবস্থা থাকলে পে ফিক্সেশন প্রযুক্তিগতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি শুধু আইবাস++ হিসাব করতে পারবে কি না—তা নয়; বরং একই কর্মচারীর বেতন কোন পর্যায়ে কীভাবে ‘ফাইনাল’ হিসেবে গণ্য হবে, সেটিই বড় বিষয়।
ধাপে ধাপে পে-স্কেল হলে কী হতে পারে?
ধরা যাক, নতুন পে-স্কেলের বর্ধিত মূল বেতনের পুরোটা একবারে কার্যকর না করে প্রথমে একটি অংশ কার্যকর করা হলো এবং পরবর্তী সময়ে বাকি অংশ কার্যকর করা হলো।
এক্ষেত্রে কর্মচারীর বর্তমান বেতন থেকে প্রথম ধাপের নতুন বেতন নির্ধারণ করতে হবে। পরে দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হলে আবার নতুন বেতন হিসাব করতে হতে পারে।
এতে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—
প্রথমত, প্রথম ধাপে নির্ধারিত বেতন কি পরবর্তী ধাপের ভিত্তি হবে?
দ্বিতীয়ত, পরবর্তী ধাপের হিসাব কি পুরোনো মূল বেতন থেকে হবে, নাকি প্রথম ধাপে নির্ধারিত নতুন বেতন থেকে?
তৃতীয়ত, এর মধ্যে যদি কারও ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতি হয়, তাহলে পরবর্তী ফিক্সেশন কীভাবে হবে?
চতুর্থত, কেউ যদি প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পর অবসরে যান, তাহলে তার পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য অবসর সুবিধার ভিত্তি কোন বেতন হবে?
এ কারণেই ‘কয় ধাপে পে ফিক্সেশন হবে’—এই সিদ্ধান্তটি শুধু সফটওয়্যারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে চাকরির সার্ভিস রেকর্ড ও অবসর-সুবিধার হিসাবও জড়িত।
অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় যারা অবসরের কাছাকাছি রয়েছেন বা পিআরএলে যাওয়ার প্রস্তুতিতে আছেন, তাদের জন্য ফিক্সেশনের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শেষ পর্যায়ের বেতন পরিবর্তিত হলে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ছুটির নগদায়নসহ সংশ্লিষ্ট সুবিধার হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় এ কারণেই অবসরপ্রাপ্ত ও অবসর-পূর্ব পর্যায়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হলে অবসর-সুবিধা নির্ধারণে বাড়তি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এক ধাপে মূল বেতন, পরে ভাতা—এমন বিকল্পও আলোচনায়
ফিক্সেশন জটিলতা কমানোর একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হতে পারে—প্রথম ধাপেই নতুন পে-স্কেলের শতভাগ মূল বেতন নির্ধারণ করা এবং পরবর্তীতে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা বা অন্যান্য ভাতা ধাপে ধাপে কার্যকর করা।
এতে মূল বেতন একবারেই চূড়ান্ত করা গেলে ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও অবসর-সুবিধার হিসাব তুলনামূলকভাবে সহজ রাখা সম্ভব হতে পারে।
তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সরকারকে একই সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং সফটওয়্যার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিবেচনা করতে হবে।
‘আইবাস++-এ সমস্যা হওয়ার কথা নয়’—কেন এমন যুক্তি
যারা মনে করছেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলেও আইবাস++-এ বড় সমস্যা হবে না, তাদের যুক্তির মূল জায়গা হলো—সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সফটওয়্যারটি ইতোমধ্যে কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের হিসাব পরিচালনা করছে।
অর্থাৎ, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পয়সা-পয়সা পর্যন্ত হিসাব করার সক্ষমতা ডিজিটাল সিস্টেমে থাকলে নতুন পে-স্কেলের ফর্মুলা অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করাও সম্ভব হতে পারে।
এই যুক্তি অনুযায়ী, ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়ন করা হলে আইবাস++-এ প্রয়োজনীয় নিয়ম, ফর্মুলা ও ডেটা-ফিল্ড যুক্ত করে প্রতিটি ধাপের বেতন হিসাব করা সম্ভব। তবে বাস্তবে সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন কতটা হবে, সেটি নির্ভর করবে চূড়ান্ত গেজেটে পে ফিক্সেশনের নিয়ম কীভাবে লেখা হচ্ছে তার ওপর।
আসল সিদ্ধান্ত গেজেটেই পরিষ্কার হবে
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পে ফিক্সেশনের চূড়ান্ত পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।
কারণ গেজেটেই নির্ধারিত হবে—
- নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে;
- মূল বেতন একবারে নাকি ধাপে ধাপে কার্যকর হবে;
- পে ফিক্সেশনের ভিত্তি কী হবে;
- ইনক্রিমেন্টের সঙ্গে নতুন বেতনের সমন্বয় কীভাবে হবে;
- পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে;
- অবসরপ্রাপ্ত ও পিআরএলভুক্তদের সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে;
- বকেয়া বেতন কীভাবে পরিশোধ করা হবে;
- এবং iBAS++-এ পে ফিক্সেশনের বাস্তবায়ন কীভাবে সম্পন্ন হবে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল নিয়ে আর্থিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো পর্যালোচনার মধ্যেই রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে এসেছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেলের গেজেট এখন ভেটিং পর্যায়ে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় বাস্তব কাজ হবে নতুন বেতন কাঠামোকে প্রতিটি কর্মচারীর ব্যক্তিগত সার্ভিস রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা।
আইবাস++-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থায় নতুন বেতন নির্ধারণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফিক্সেশন এক ধাপে হবে নাকি একাধিক ধাপে হবে, কোন ধাপকে চূড়ান্ত ধরা হবে এবং অবসর-সুবিধার হিসাব কীভাবে হবে—এই নীতিগত সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা শুধু ‘গেজেট কবে’ নয়; বরং গেজেটে পে ফিক্সেশনের নিয়ম কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে—সেদিকেও সমান নজর রাখা।



