৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

৯ম পে-স্কেল ও নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারী : আশার আলো নাকি আমলাতান্ত্রিক লুকোচুরি?

বাজারের আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে দেশের নিম্ন বেতনভোগী (১১-২০ গ্রেডের) সরকারি কর্মচারীদের। ২০১৫ সালের সর্বশেষ পে-স্কেলের পর দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি ৯ম জাতীয় পে-স্কেল। সম্প্রতি জাতীয় বেতন কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সরকারি কৌশল সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চাপা ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


ধুঁকছে ৬৫% কর্মচারী: ‘আইসিইউ’ পর্যায়ে জীবনযাত্রা

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন ও মাঠপর্যায়ের তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর মধ্যে একটি বিশাল অংশ—বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা—তীব্র আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় মেলাতে না পেরে প্রায় ৬৫% সরকারি কর্মচারী আজ বিভিন্ন ব্যাংক, সমবায় সমিতি বা ব্যক্তিগত উৎস থেকে ঋণগ্রস্ত। এর মধ্যে প্রায় ৩৫% কর্মচারীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, যাকে অনেকেই ‘আইসিইউ’ বা চরম সংকটাপন্ন পর্যায় বলে অভিহিত করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিবালয়ের একজন কর্মচারী আক্ষেপ করে বলেন,

“আমরা না পারি আমাদের কষ্ট কাউকে দেখাতে, না পারি মুখ ফুটে বলতে। বাজারে গেলে আমাদের বেতনের টাকা নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। অথচ বড় বড় ঋণখেলাপী ও অর্থ পাচারকারীরা মহাসুখে দিন কাটাচ্ছে, আর আমরা সৎভাবে বাঁচতে চেয়েও ঋণের জালে আটকে যাচ্ছি।”


৯ম পে-স্কেল নিয়ে লুকোচুরির খতিয়ান: কমিশন বনাম বাস্তবতা

সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৯ম পে-স্কেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের দেওয়া সুপারিশ ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্রটি নিম্নরূপ:

  • কমিশনের সুপারিশ: সর্বনিম্ন গ্রেডে (২০তম গ্রেড) বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা (১৪২% বৃদ্ধি) এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে (১ম গ্রেড) ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের বৈষম্য ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮ এ আনার কথা বলা হয়।

  • বাস্তবায়নের লুকোচুরি (তিন ধাপের কৌশল): অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল একবারে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না করে ৩টি ধাপে আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

    • ১ম বছর (১ জুলাই ২০২৬): শুধুমাত্র মূল বেতনের (Basic) ৫০% দেওয়া হতে পারে।

    • ২য় বছর (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি ৫০% কার্যকর হতে পারে।

    • ৩য় বছর (২০২৮-২৯ অর্থবছর): চিকিৎসা, বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হতে পারে।

এই দীর্ঘমেয়াদী এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে কর্মচারীরা “লুকোচুরি ও কালক্ষেপণ” হিসেবে দেখছেন। যেখানে বর্তমান বাজারমূল্যে আজই টিকে থাকা দায়, সেখানে ২০২৮ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য একপ্রকার প্রহসন।


মে মাস জুড়েই আল্টিমেটাম: আন্দোলনের ডাক

১১ বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়াই করতে করতে কর্মচারীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সংহতি পরিষদ’ সহ বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় সংগঠন মে মাস জুড়েই ৯ম পে-স্কেল একযোগে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে চূড়ান্ত ও জোরালো আল্টিমেটাম দিয়েছে।

নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট বক্তব্য—নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই (১ জুলাই থেকে) এই পে-স্কেল একবারে কার্যকর করতে হবে। যদি সরকার আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে ফেলে এটিকে ঝুলিয়ে রাখতে চায়, তবে মে মাসের এই আল্টিমেটাম শেষে জুন মাস থেকে বড় ধরনের লাগাতার কর্মবিরতি ও কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হতে পারে।


বিশ্লেষকদের মত: কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় জরুরি

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। বড় বড় অসৎ আমলা বা আর্থিক খাতের শীর্ষ লুটেরাদের তোষণ না করে, সাধারণ কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

যদি এই বিপুল সংখ্যক কর্মচারীর ক্ষোভকে আমলে না নিয়ে “লুকোচুরি”র নীতি বজায় রাখা হয়, তবে অতীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের (যেমন ৩৬ জুলাইয়ের চেতনা) মতোই এই বঞ্চিত শ্রেণির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে ফিরে আসতে পারে। তাই মে মাসের এই আল্টিমেটামকে হালকাভাবে না নিয়ে কর্তাব্যক্তিদের অতি দ্রুত বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *