সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা অধ্যাদেশ সংশোধন: বাদ পড়ল ‘আধা-স্বায়ত্তশাসিত’ শব্দগুচ্ছ
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করে জারিকৃত অধ্যাদেশে সংশোধন এনেছে সরকার। সোমবার (২২ ডিসেম্বর ২০২৫) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই সংশোধিত গেজেট বা বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
সংশোধিত এই অধ্যাদেশে মূলত পূর্বের মূল অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারা থেকে ‘আধা-স্বায়ত্তশাসিত’ শব্দগুচ্ছটি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগ বিধিমালার কার্যকারিতা নিয়ে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
গেজেটে যা বলা হয়েছে: বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর সংশোধন করা প্রয়োজন বলে সরকারের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে। বর্তমানে সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় থাকায় সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেছেন।
প্রধান পরিবর্তনসমূহ: ১. শিরোনাম ও সংজ্ঞায় পরিবর্তন: মূল অধ্যাদেশের পূর্ণাঙ্গ শিরোনাম, প্রস্তাবনা এবং বিভিন্ন ধারা (ধারা ১ ও ধারা ৩-এর দফা গ) থেকে ‘আধা-স্বায়ত্তশাসিত’ শব্দটি ও সংশ্লিষ্ট চিহ্নসমূহ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এই অধ্যাদেশটি ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ নামে পরিচিত হবে।
২. নতুন ধারার সংযোজন (ধারা ৩ক): সংশোধিত অধ্যাদেশে একটি নতুন ধারা (৩ক) যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যে সকল সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিমালা বা প্রবিধানমালায় সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছরের বেশি নির্ধারিত রয়েছে, সেই সকল ক্ষেত্রে ওই অধিকতর বয়সসীমা অপরিবর্তিত ও বহাল থাকবে। অর্থাৎ, ৩২ বছরের বেশি বয়সসীমার সুবিধা যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই ছিল, তা এই অধ্যাদেশের কারণে কমবে না।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং সেই লক্ষ্যে ২০২৪ সালে প্রথম অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশের প্রায়োগিক ক্ষেত্র এবং আইনি অস্পষ্টতা দূর করা হলো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কি?
সহজ কথায়, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান (Semi-Autonomous Institutions) বলতে এমন সব সংস্থাকে বোঝায় যেগুলো সরকারের অধীনে গঠিত হলেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ এবং আয়ের ক্ষেত্রে অনেকটা স্বাধীনতা ভোগ করে।
এগুলো পুরোপুরি সরকারি দপ্তরের মতো নয়, আবার পুরোপুরি বেসরকারিও নয়। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ
এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, কিন্তু এদের একটি নিজস্ব বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা পরিচালনা পর্ষদ থাকে। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজ কীভাবে চলবে, সেই সিদ্ধান্ত এই পর্ষদ নিতে পারে। তবে বড় ধরনের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হয়।
২. আর্থিক ব্যবস্থা
আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয়ের জন্য পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভর করে না। এদের নিজস্ব আয়ের উৎস থাকে (যেমন ফি বা সেবা মূল্য)। তবে ঘাটতি মেটাতে বা বড় প্রকল্পের জন্য তারা সরকার থেকে অনুদান বা ঋণ পায়।
৩. নিয়োগ ও বেতন কাঠামো
এসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিমালা থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বেতন কাঠামো সরকারি পে-স্কেলের সাথে মিল থাকলেও, বোনাস বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তারা কিছুটা ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করতে পারে।
৪. উদাহরণ
বাংলাদেশে আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কিছু উদাহরণ হলো:
বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে এর স্বায়ত্তশাসন অনেক বেশি)।
বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (যেমন: রাজউক)।
বন্দর কর্তৃপক্ষ (যেমন: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ)।
ওয়াসা (WASA)।
সংক্ষেপে: সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৈরি করে দেয় এবং তদারকি করে, কিন্তু কাজের গতি বাড়াতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে এদেরকে কিছুটা ‘স্বাধীনতা’ বা ‘স্বায়ত্তশাসন’ দেওয়া হয়।



