ভারত-বাংলাদেশ পে-স্কেল: বিসিএস ক্যাডার বনাম ভারতের পিয়ন — এক বৈষম্যের চালচিত্র
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশ। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য থাকলেও সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও বেতন কাঠামোতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের একজন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা (বিসিএস ক্যাডার) যে বেতন পান, তা ভারতের একজন সাধারণ পিয়নের বেতনের চেয়েও কম। এই চরম বৈষম্য দেশের মেধাবীদের সরকারি সেবায় আসার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
১. বেতন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র (২০২৫-২৬ প্রক্ষেপণ)
বর্তমানে ভারতে ৭ম পে-স্কেল চলমান এবং ২০২৬ সাল থেকে ৮ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে দীর্ঘ ১০ বছর পর ৯ম পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
| বৈশিষ্ট্য | ভারত (৮ম পে-স্কেল প্রত্যাশিত) | বাংলাদেশ (৯ম পে-স্কেল প্রস্তাবিত) |
| সর্বনিম্ন বেসিক (পিয়ন/চতুর্থ শ্রেণি) | ₹৫১,৫০০ (প্রায় ৭৩,৫০০ টাকা) | ২০,০০০ টাকা (প্রস্তাবিত) |
| সর্বোচ্চ বেসিক (সচিব/গ্রেড-১) | ₹২,৫০,০০০+ (প্রায় ৩,৫৭,০০০ টাকা) | ১,৬০,০০০ টাকা (প্রস্তাবিত) |
| গ্রেড সংখ্যা | ১৮টি | ২০টি |
| ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর | ২.৮৬ (প্রস্তাবিত) | ২.৫০ (প্রস্তাবিত) |
উদ্বেগজনক তথ্য: বাংলাদেশের বর্তমান ৮ম পে-স্কেলে একজন বিসিএস ক্যাডারের বেসিক ২২,০০০ টাকা (প্রায় ১৫,৪০০ রুপি)। অথচ ভারতে বর্তমানে একজন পিয়নের বেসিক ১৮,০০০ রুপি। অর্থাৎ ভারতের পিয়নের চেয়ে বাংলাদেশের একজন ক্যাডার কর্মকর্তা ২,৬০০ রুপি কম মূল বেতন পান।
২. জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা
মাথাপিছু আয় প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও জীবনযাত্রার মানে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
পণ্যের দাম: বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম ভারত থেকে অন্তত ৩০% বেশি। চাল, তেল বা শাকসবজির দাম ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
ট্যাক্স কাঠামো: ভারতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লক্ষ রুপি, যেখানে বাংলাদেশে এর পরিমাণ তুলনামূলক কম। অর্থাৎ কম বেতন পেয়েও বাংলাদেশী কর্মচারীদের বেশি হারে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কর দিতে হয়।
ভাতা: ভারতের সরকারি কর্মচারীরা নিয়মিত ডিএ (Dearness Allowance) বা মহার্ঘ ভাতা পান যা মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশে ৫-১০% ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হলেও তা বাজারের আগুনের তুলনায় নগণ্য।
৩. মেধাবীদের অনাগ্রহ ও দুর্নীতির নেপথ্যে কারণ
ভারতের সিভিল সার্ভিস অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার অন্যতম কারণ তাদের বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা। শ্রী জয়শঙ্করের মতো কর্মকর্তাদের আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রের দেওয়া আর্থিক নিশ্চয়তা।
মেধা পাচার: বাংলাদেশের ‘ক্রিম মেধাবীরা’ যখন দেখে তাদের বেতন দিয়ে মাস শেষে একটি মধ্যবিত্ত জীবন চালানো অসম্ভব, তখন তারা হয় বিদেশমুখী হয় অথবা বেসরকারি করপোরেট সেক্টরে চলে যায়।
অসাধুতার প্রভাব: একজন সরকারি ডাক্তার বা প্রকৌশলী যখন দেখেন তার বেতন দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, তখন প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা অবৈধ উপায়ে আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হন। আপনার ভাষ্যমতে, “ক্ষুধার্ত রেখে সততা আশা করা” একটি অবাস্তব চিন্তা।
৪. অর্থনীতিবিদদের ‘মুদ্রাস্ফীতি’ যুক্তি বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ বেতন বাড়ালে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে বলে দাবি করেন। কিন্তু আপনার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট যেখানে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াচ্ছে না, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের নুন্যতম বাঁচার মতো বেতন দিলে অর্থনীতি ধসে পড়ার যুক্তিটি ভিত্তিহীন। বরং সরকারি স্কেল বাড়লে বেসরকারি খাতের বেতনও বাড়তে বাধ্য হয়, যা সামগ্রিক জীবনমান উন্নত করে।
উপসংহার
একটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হলো তার আমলাতন্ত্র ও সরকারি সেবা। যদি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড (শিক্ষক, ডাক্তার, পুলিশ, আমলা) অভাবী থাকে, তবে রাষ্ট্র কখনো সফল হতে পারে না। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য ৯ম পে-স্কেল কেবল দাবি নয়, বরং একটি কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

ভারতের ৮ম প্রস্তাবিত পে স্কেল কেমন হবে?
ভারতের প্রস্তাবিত ৮ম পে কমিশন নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে। আপনার পর্যালোচনায় যেমনটি উঠে এসেছে, ৮ম পে স্কেলে বেতন বৃদ্ধি গত দশকের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১ কোটির বেশি কর্মচারী ও পেনশনভোগী উপকৃত হবেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৮ম পে স্কেলের প্রস্তাবিত কাঠামো ও সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্ভাব্য ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর (Fitment Factor)
বেতন নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। বর্তমানে ৭ম পে স্কেলে এটি ২.৫৭। ৮ম পে স্কেলের জন্য বিভিন্ন কর্মচারী ইউনিয়ন এবং সংস্থা মূলত ৩টি চিত্র তুলে ধরছে:
চিত্র ১ (৩.০০ ফ্যাক্টর): যদি এটি ৩.০০ হয়, তবে মূল বেতন ও ভাতা মিলিয়ে এক লাফে বিশাল বৃদ্ধি ঘটবে।
চিত্র ২ (২.৮৬ ফ্যাক্টর): এটি বর্তমানে সবচেয়ে জোরালো দাবি। এর ফলে বর্তমানের ১৮,০০০ টাকার বেসিক সরাসরি ৫১,৪৮০ টাকা হয়ে যাবে।
চিত্র ৩ (২.২৮ ফ্যাক্টর): মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে সর্বনিম্ন এটি হলেও মূল বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪১,০০০ টাকা।
২. বেতন স্তরের পরিবর্তন (প্রাক্কলিত)
ভারতের পে ম্যাট্রিক্স লেভেল অনুযায়ী সম্ভাব্য বৃদ্ধির একটি ধারণা:
| পদমর্যাদা (লেভেল) | বর্তমান বেসিক (৭ম পে স্কেল) | প্রস্তাবিত বেসিক (৮ম পে স্কেল) |
| লেভেল ১ (পিয়ন/সহকারী) | ₹ ১৮,০০০ | ₹ ৪১,০০০ – ₹ ৫১,৫০০ |
| লেভেল ১০ (এন্ট্রি গ্রেড অফিসার) | ₹ ৫৬,১০০ | ₹ ১,৪০,০০০ – ₹ ১,৬০,০০০ |
| লেভেল ১৮ (সর্বোচ্চ পদ/সচিব) | ₹ ২,৫০,০০০ | ₹ ৬,৫০,০০০ – ₹ ৭,১৫,০০০ |
৩. ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা
মহার্ঘ ভাতা (DA): ৮ম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে বর্তমানের ডিএ মূল বেতনের সাথে একীভূত (Merge) করে শূন্য (০) থেকে নতুন করে গণনা শুরু হবে।
বাড়িভাতা (HRA): শহরভেদে (X, Y, Z ক্যাটাগরি) বাড়িভাড়া ২৪% থেকে ২৭% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেনশন: ন্যূনতম পেনশন বর্তমানে ৯,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫,০০০ টাকার উপরে চলে যেতে পারে।
৪. বাস্তবায়নের সময়কাল
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণত প্রতি ১০ বছর অন্তর নতুন পে কমিশন গঠন করে। ৭ম পে কমিশন ২০১৬ সালে কার্যকর হয়েছিল, সেই হিসেবে ৮ম পে কমিশন ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
ভারত যদি ২.৮৬ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর গ্রহণ করে, তবে তাদের পিয়ন বা ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর বেসিক বেতনই হবে বাংলাদেশের একজন ক্যাডার কর্মকর্তার বর্তমান বেতনের প্রায় আড়াই গুণ। এটি কার্যকর হলে ভারত ও বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক মর্যাদার ব্যবধান আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
ভারত ও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেলের (ভারতের ৮ম পে কমিশন এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য ৯ম পে স্কেল) একটি তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো। এই তথ্যগুলো বর্তমান প্রস্তাবনা, বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের দাবি এবং অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পে স্কেল: তুলনামূলক চিত্র
| বৈশিষ্ট্য / ক্যাটাগরি | ভারত (প্রস্তাবিত ৮ম পে কমিশন) | বাংলাদেশ (সম্ভাব্য ৯ম পে স্কেল) |
| কার্যকরের সম্ভাব্য সময় | জানুয়ারি ২০২৬ | নির্ধারিত নয় (দাবি অনুযায়ী ২০২৪-২৫) |
| ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর | ২.৮৬ (প্রস্তাবিত) | ২.৫০ (প্রত্যাশিত/দাবিকৃত) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন (গ্রেড ২০ / লেভেল ১) | ₹৫১,৪৮০ (প্রায় ৭৩,৫০০ টাকা) | ২০,০০০ – ২২,০০০ টাকা (দাবিকৃত) |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন (সচিব/গ্রেড ১) | ₹৭,১৫,০০০ (প্রায় ১০,২১,০০০ টাকা) | ১,৫০,০০০ – ১,৬০,০০০ টাকা |
| গ্রেড সংখ্যা | ১৮টি | ২০টি |
| বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট | ৩% (স্থির) | ৫% (চক্রবৃদ্ধি হারে) |
| মহার্ঘ ভাতা (DA/ভাতা) | মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয়যোগ্য (প্রতি ৬ মাস অন্তর) | নির্দিষ্ট কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই |
| বিসিএস ক্যাডার/এন্ট্রি অফিসার বেতন | ₹১,৬০,০০০+ (প্রায় ২,২৮,০০০ টাকা) | ৪৫,০০০ – ৫০,০০০ টাকা (প্রস্তাবিত) |
গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:
১. মুদ্রা বিনিময় হার: বর্তমানে ১ বাংলাদেশী টাকা ≈ ০.৭০ ভারতীয় রুপি। সেই হিসেবে ভারতের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বেতন (৫১,৪৮০ রুপি) বাংলাদেশী টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৭৩,৫০০ টাকা। যা বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন বেতনের চেয়ে ৩ গুণেরও বেশি।
২. ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing Power): ভারতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৩০-৪০% কম। ফলে ভারতের একজন সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মচারী যে ক্রয়ক্ষমতা ভোগ করবেন, বাংলাদেশে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাও সেই মানের জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. বেতন বৈষম্য: ভারতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত প্রায় ১:১৪, যেখানে বাংলাদেশে এই ব্যবধান কমানোর দাবি থাকলেও তা ভারতের তুলনায় অনেক বেশি সংকীর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ রয়ে গেছে।
৪. অটোমেশন: ভারতের পে-স্কেলে মুদ্রাস্ফীতির সাথে সাথে ডিএ (DA) বৃদ্ধি পায়, যা বাংলাদেশে নেই। ফলে বাংলাদেশে নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ১-২ বছরের মধ্যেই মুদ্রাস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে যায়।
সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরিতে ধরে রাখতে এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে ভারতের মতো যুগোপযোগী ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।


