বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

জানুয়ারিতেই জমা হতে পারে ৯ম পে-স্কেলের সুপারিশ: তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন তাদের কার্যক্রমের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী জানুয়ারি ২০২৬ মাসের মধ্যেই কমিশন তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে দ্রুত নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনে অনড় রয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ

তিন ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা

গত ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় বেতন কমিশনের ৫ম পূর্ণাঙ্গ সভায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের একটি খসড়া পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হবে:

১. প্রথম ধাপ: জাতীয় বেতন কমিশন সকল অংশীজনের মতামত বিশ্লেষণ করে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ তৈরি করবে।

২. দ্বিতীয় ধাপ: প্রতিবেদনটি সরকারের সচিব কমিটির সভায় উত্থাপন করা হবে। সেখানে প্রশাসনিক ও আর্থিক দিকগুলো পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেওয়া হবে।

৩. তৃতীয় ধাপ: চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পেশ করা হবে। এরপরই নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশিত হবে।

কর্মচারী সংগঠনগুলোর ৭ দফা দাবি

দীর্ঘদিন ধরে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা বৈষম্য দূরীকরণে ৭ দফা দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অবিলম্বে ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা।

  • পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ৫০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা প্রদান।

  • ২০১৫ সালের পে-স্কেলে বাতিল হওয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল।

  • বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৩ সালের ঘোষণা অনুযায়ী ১০ ধাপে বেতন স্কেল নির্ধারণ।

  • সচিবালয়ের মতো সকল দপ্তরের পদনাম পরিবর্তন ও বৈষম্য নিরসন।

বাজেট ও বাস্তবায়ন সম্ভাবনা

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে ‘মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো’ অনুসরণের উদ্যোগ নিয়েছে। পে-কমিশনের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, প্রস্তাবিত নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকার মধ্যে রাখার সুপারিশ আসতে পারে এবং বিদ্যমান ২০টি গ্রেড কমিয়ে ১৫টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা গেজেট প্রকাশের ঘোষণা না এলে তারা আগামী মার্চ মাস থেকে দেশব্যাপী কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচিতে যেতে পারেন।

বিশ্লেষণ

বাজারের বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এই পে-স্কেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে কমিশন ধাপে ধাপে এটি কার্যকরের পরিকল্পনা করছে। সাধারণ কর্মচারীদের প্রত্যাশা, জানুয়ারিতে রিপোর্ট জমা হলে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই তারা নতুন কাঠামোর সুফল পাবেন।

বর্তমান সরকার কি বৈষম্য নিরসনে পদক্ষেপ নিবে না?

বর্তমান সরকারের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন কমিশনের তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈষম্য নিরসনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ইতিমত্যে নেওয়া হয়েছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ১১-২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিরসনে এই পদক্ষেপগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বৈষম্য নিরসনে বর্তমান সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন

সরকার জনপ্রশাসনে বিদ্যমান কাঠামো এবং বেতন বৈষম্য খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এই কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তা কমিয়ে আনা।

২. বেতন বৈষম্য নিরসন কমিটি

আপনার সরবরাহকৃত তথ্যানুযায়ী, ৯ম পে-স্কেলের সুপারিশ তৈরিতে কমিশন যে ৩টি ধাপ নির্ধারণ করেছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো বৈষম্য কমানো। বিশেষ করে সচিবালয়ের বাইরের দপ্তরগুলোতে পদনাম ও গ্রেড বৈষম্য দূর করতে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে।

৩. গ্রেড সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব

বর্তমানে বাংলাদেশে ২০টি গ্রেড রয়েছে, যার ফলে উচ্চপদস্থ এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বেতনের ব্যবধান অনেক বেশি। সরকার ও পে-কমিশন এই ২০টি গ্রেডকে কমিয়ে ১০ থেকে ১২টি গ্রেডে নিয়ে আসার কথা ভাবছে। গ্রেড সংখ্যা কমলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বৈষম্য অনেকটা কমে আসবে।

৪. টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল নিয়ে আলোচনা

২০১৫ সালের পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করা হয়েছিল, যা নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতি ছিল। বর্তমান সরকার এই দুটি সুবিধা পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি ও আর্থিক দিকগুলো পর্যালোচনা করছে।


বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জসমূহ

সরকার পদক্ষেপ নিলেও কিছু বাস্তবসম্মত কারণে প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে:

  • বিশাল বাজেট বরাদ্দ: নতুন পে-স্কেল এবং বৈষম্য দূর করতে সরকারের বাজেটে বড় অংকের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়।

  • মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: একসঙ্গে সবার বেতন অনেক বাড়িয়ে দিলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সরকার ধাপে ধাপে আগানোর পরিকল্পনা করছে।

  • নীতিমালা সংশোধন: কয়েক দশকের পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ কাজ।

সারসংক্ষেপ

সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে না—একথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী পদক্ষেপগুলোর গতি এখনো ধীর। যদি জানুয়ারিতে পে-কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ে এবং সরকার সেটি দ্রুত কার্যকর করে, তবেই বৈষম্য নিরসনে সরকারের আন্তরিকতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে।

Alamin Mia

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

4 thoughts on “জানুয়ারিতেই জমা হতে পারে ৯ম পে-স্কেলের সুপারিশ: তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

  • Kazi Nasim Uddin

    শতবাগ পেনশন সমাপনকারীদের পূনংস্থাপন ১৫ এর বদলে ১০ বছর কি হবে?

  • হবে। অপেক্ষা করুন।

  • কামাল রশীদ

    যারা পেনশন ভোগী,তাঁদের জন্য নতুন পে স্কেলে কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে ?

  • কর্মরতগন যে হারে সুযোগ সুবিধা পাবেন সেই একই হারে পেনশনারগণও পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *