৯ম জাতীয় পে-স্কেল: জুনেই গেজেটের সম্ভাবনা, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শেষ?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত ঘোষণা দেওয়ার পর প্রশাসনে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলের খসড়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্যালোচনায় রয়েছে এবং চলতি জুন মাসের মধ্যেই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর কার্যক্রম শুরু করা।
জুনের শেষ সপ্তাহেই গেজেটের সম্ভাবনা
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের প্রায় সব কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে জুনের শেষ সপ্তাহ অথবা জুলাইয়ের প্রথম দিকেই গেজেট প্রকাশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ ২০১৫ সালের পর এবারই প্রথম জাতীয় বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় সরকার একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী—
প্রথম ধাপ (১ জুলাই ২০২৬):
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী মূল বেতনের উল্লেখযোগ্য অংশ বৃদ্ধি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, সম্ভাব্যভাবে নতুন বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ সমন্বয় প্রথম ধাপেই কার্যকর হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর):
মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশ সম্পূর্ণ সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন স্কেলের পূর্ণ মূল বেতন ভোগ করতে পারবেন।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর):
বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, উৎসব ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এর আগে পর্যন্ত এসব ভাতা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী বহাল থাকবে।
২০ গ্রেডই বহাল রাখার প্রস্তাব
সর্বশেষ খসড়া অনুযায়ী বর্তমানের ২০ গ্রেড কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বৃদ্ধি করে বেতন বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ সুবিধা বাতিলের পরিকল্পনা
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ পাচ্ছেন, তা নতুন পে-স্কেল কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হতে পারে।
তবে এই সুবিধা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করে নতুন মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় (Absorb) করা হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে কর্মচারীদের মোট আর্থিক সুবিধা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য বড় সুখবর
নতুন পে-স্কেলের আলোচনায় সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে পেনশনভোগীদের জন্য প্রস্তাবিত সুবিধাগুলোকে।
খসড়া সুপারিশ অনুযায়ী—
- মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
- ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
- ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
- ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
পেনশনভোগীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা
জানা গেছে, খসড়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করা হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি, বাস্তবায়নের ধাপ এবং পেনশন সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি গেজেট প্রকাশের পরই চূড়ান্ত কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের দৃষ্টি এখন আসন্ন গেজেট প্রকাশের দিকে। কারণ সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের লাখো কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্তদের ভবিষ্যৎ বেতন ও আর্থিক সুবিধার প্রকৃত রূপরেখা।


