মাতৃত্বকালীন ভাতা ২০২৬: যোগ্য মায়েরা কীভাবে আবেদন করবেন, কত টাকা পাবেন ও যেসব তথ্য জানা জরুরি
দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের গর্ভবতী মায়েদের আর্থিক সহায়তা দিতে সরকারের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ চালু রয়েছে। এটি আগের ‘দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা’ এবং ‘কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা’ কর্মসূচির সমন্বিত ও আধুনিক সংস্করণ। কর্মসূচিটির লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, যত্ন এবং শিশুর প্রাথমিক বিকাশে সহায়তা করা।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত মাতৃত্বকালীন ভাতা সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্টে আবেদন পদ্ধতি, ভাতার পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। সরকারি তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, এই কর্মসূচির দায়িত্ব মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের। এর জন্য আলাদা MIS ব্যবস্থাও রয়েছে।
মাসে ৮৫০ টাকা, সর্বোচ্চ ৩৬ মাস
বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র আওতায় ভাতার হার মাসিক ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। নির্বাচিত উপকারভোগীরা সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সহায়তা পেতে পারেন। অর্থাৎ পুরো মেয়াদে মাসিক হার অপরিবর্তিত থাকলে মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৬০০ টাকা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মায়াদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাধারণভাবে আবেদনকারীর বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর হওয়ার শর্তও উল্লেখ রয়েছে।
কারা এই ভাতা পাওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারেন?
সরকারি বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে সাধারণভাবে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেগুলো হলো—
- দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের গর্ভবতী নারী;
- বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে;
- প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভধারণ/সন্তানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার;
- জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা;
- নির্ধারিত আর্থসামাজিক যোগ্যতা পূরণ করা;
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন, পৌরসভা বা এলাকার নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে নির্বাচিত হওয়া।
কিছু স্থানীয় সরকারি নির্দেশনায় আবেদনের সময় ৪ থেকে ৬ মাসের গর্ভাবস্থা থাকার শর্তও উল্লেখ রয়েছে। তাই শুধু গর্ভবতী হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পাওয়া যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। স্থানীয় বরাদ্দ, যাচাই ও নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত নির্বাচন করা হয়।
আবেদন করলেই ভাতা নিশ্চিত নয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। অনলাইনে তথ্য দেওয়া বা আবেদন করলেই কেউ সরাসরি ভাতাভোগী হয়ে যান না।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের MIS ব্যবস্থায় আবেদন গ্রহণের পর প্রাথমিক বাছাই, ডাবল-ডিপিং যাচাই, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং চূড়ান্ত বাছাই-এর মতো ধাপ রয়েছে। অর্থাৎ আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর যোগ্য ব্যক্তিদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
টাকা কীভাবে পাওয়া যায়?
বর্তমান ব্যবস্থায় ভাতা সরাসরি উপকারভোগীর নিজস্ব আর্থিক হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের নির্দেশনায় নিজ জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত MFS অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। ফলে অন্যের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে নিজের NID-সংযুক্ত হিসাব ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং MIS-এর সঙ্গে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সমন্বয় রয়েছে।
তাহলে অনলাইনে কোথায় আবেদন করবেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে mis.bhata.gov.bd/onlineApplication-কে মাতৃত্বকালীন ভাতার আবেদন লিংক হিসেবে প্রচার করা হলেও সরকারি তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, এই লিংকটি মূলত সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন ভাতা, যেমন বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার অনলাইন আবেদনে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের নিজস্ব MIS ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি MIS সাইটে ডিজিটাল আবেদন, আবেদন যাচাই, চূড়ান্ত নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, অভিযোগ ও ভাতা ব্যবস্থাপনার তথ্য রয়েছে।
মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির সরকারি MIS পোর্টাল
তাই কোনো ফেসবুক পোস্টে দেওয়া লিংকে অন্ধভাবে তথ্য বা NID দেওয়ার আগে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট কি না যাচাই করা উচিত।
কী কী তথ্য প্রস্তুত রাখবেন?
আবেদনের সময় সাধারণত আবেদনকারীর পরিচয়, ঠিকানা, গর্ভাবস্থা, পরিবার ও আর্থিক অবস্থার তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। নিজের NID, মোবাইল নম্বর এবং নিজের নামে NID-সংযুক্ত MFS/ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রস্তুত রাখা নিরাপদ।
স্থানীয় কার্যালয়ভেদে অতিরিক্ত কাগজপত্র বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
আবেদন থেকে টাকা পাওয়া পর্যন্ত কী হয়?
পুরো প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এভাবে এগোয়—
আবেদন → প্রাথমিক বাছাই → তথ্য যাচাই → অগ্রাধিকার নির্ধারণ → মাঠপর্যায়ে যাচাই → চূড়ান্ত নির্বাচন → ভাতাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তি → নিজস্ব হিসাবের মাধ্যমে অর্থ প্রদান।
অর্থাৎ আবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাওয়ার কথা নয়।
কেন এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ?
গর্ভাবস্থায় দরিদ্র পরিবারের নারীরা একদিকে আয়-রোজগারের সক্ষমতা হারান, অন্যদিকে চিকিৎসা, পুষ্টি ও প্রসবসংক্রান্ত ব্যয় বেড়ে যায়। এ কারণে কর্মসূচিটির লক্ষ্য শুধু মাকে নগদ অর্থ দেওয়া নয়; বরং গর্ভকাল থেকে শিশুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত পুষ্টি ও বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি, যত্ন, শিশুর পুষ্টি, মনোসামাজিক বিষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে কর্মসূচির আওতায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৯ জন উপকারভোগীকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর জানিয়েছে।
প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন
মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে কেউ যদি—
- আবেদন করিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা চায়,
- OTP চায়,
- NID-এর ছবি বা তথ্য নিয়ে নিজের ফোনে সংরক্ষণ করতে বলে,
- নিজের MFS অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলে,
- ‘নিশ্চিত ভাতা পাইয়ে দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দেয়,
তাহলে সতর্ক হতে হবে।
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্য জানতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
শেষ কথা
২০২৬ সালে দরিদ্র ও যোগ্য গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ। বর্তমানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী মাসিক ৮৫০ টাকা করে সর্বোচ্চ ৩৬ মাস সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটি সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় ভাতা নয়; নির্ধারিত বয়স, গর্ভধারণের পর্যায়, আর্থসামাজিক অবস্থা, সন্তানসংখ্যা, স্থানীয় বরাদ্দ এবং যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মাতৃত্বকালীন ভাতার নামে প্রচারিত যেকোনো অনলাইন লিংকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সরকারি উৎস যাচাই করুন। কারণ সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাধারণ ভাতা আবেদনের MIS এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র MIS এক বিষয় নয়।



