৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬: বাড়িভাড়া ভাতার অসামঞ্জস্য দূর ও উচ্চতর গ্রেড স্পষ্ট করার আবেদন
নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন বিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার হার, উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সময়সীমা এবং পূর্বে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে এসব বিষয় স্পষ্ট করার জন্য ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীদের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে একটি লিখিত আবেদন করা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের ওই আবেদনে জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এ বাড়িভাড়া ভাতার অসামঞ্জস্য দূর করতে জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫-এর নিয়মে বাড়িভাড়া ভাতা বহাল রাখা এবং উচ্চতর গ্রেডের কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনে বাড়িভাড়া নিয়ে যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে
আবেদনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোয় ১৬তম থেকে ২০তম গ্রেডের তুলনায় ১১তম থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার হার কম নির্ধারিত হয়েছে। তাদের মতে, এটি একটি বেতন ও ভাতা-সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য তৈরি করছে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫-এর বিধান অনুযায়ী বাড়িভাড়া ভাতা ৩০ জুন ২০১৫ তারিখে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী বহাল রাখার ব্যবস্থা ছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোয় ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো হারে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে; নতুন হারে বাড়িভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
নতুন কাঠামোয় গ্রেড ও কর্মস্থলভেদে বাড়িভাড়ার হারও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়ার শতকরা হার আগের মতো না থাকায় বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে ভাতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আবেদনকারীরা তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে ২০১৫ সালের নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া ভাতা বহাল রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
উচ্চতর গ্রেড নিয়েও স্পষ্টীকরণের আবেদন
আবেদনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সময়সীমা।
জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী একই পদে পদোন্নতি ছাড়া ১০ বছর পূর্ণ হলে সন্তোষজনক চাকরির শর্তে ১১তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান ছিল। এরপর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ছয় বছর পদোন্নতি না হলে সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ ছিল।
নতুন জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এ এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ৮ বছর পূর্তিতে ৯ম বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ছয় বছর পূর্তিতে ৭ম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬-এর আগে ৮ বছর পূর্ণকারীদের বিষয়
নতুন গেজেট অনুযায়ী, যেসব স্থায়ী কর্মচারীর ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে একই পদে আট বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু ১০ বছর পূর্ণ হয়নি, তারাও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হবেন—যদি অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়।
এই বিধানের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও কর্মচারীদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। আবেদনে তাই উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কোন তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা হবে এবং বিভিন্ন পুরোনো পরিস্থিতিতে নতুন বিধান কীভাবে প্রয়োগ হবে—তা স্পষ্ট করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আগে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কী হবে?
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—একই পদে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা সাধারণভাবে দুইবারের বেশি নেওয়া যাবে না।
এছাড়া কোনো কর্মচারী আগের বেতনস্কেলগুলোর আওতায় একই পদে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ওই পদে আবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের জন্য পরবর্তী ছয় বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এই বিষয়টিই আবেদনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুই বা ততোধিক উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের বিষয়েও দাবি
আবেদনে বলা হয়েছে, একই পদে কর্মরত কোনো কর্মচারী অতীতে দুই বা ততোধিক উচ্চতর গ্রেড—যেমন টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড—পেয়ে থাকলে নতুন পে-স্কেলে তার বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কীভাবে বিধান কার্যকর হবে, সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত কিন্তু পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পূর্বের সুবিধা ও নতুন পে-স্কেলের উচ্চতর গ্রেডের বিধান কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট অফিস আদেশের দাবি জানানো হয়েছে।
ব্লকড বা পদোন্নতির সুযোগ নেই—এমন পদের বিষয়
নতুন পে-স্কেলে পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ব্লকড পদে কর্মরতদের জন্যও উচ্চতর গ্রেডের বিশেষ বিধান রয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মচারী প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে আরও আট বছর পূর্ণ করলে সন্তোষজনক চাকরির শর্তে নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। একই পদে পুরো চাকরিজীবনে এ সুবিধা সর্বোচ্চ তিনবার পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ধরনের বিধানের সঙ্গে পূর্বে পাওয়া টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড কীভাবে সমন্বয় হবে, সেটিও কর্মচারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন এই আবেদন গুরুত্বপূর্ণ?
নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হচ্ছে। গেজেট অনুযায়ী মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাতাগুলোর পূর্ণাঙ্গ নতুন কাঠামো পরবর্তী সময়ে কার্যকর হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য কয়েকটি ভাতা ৩০ জুন ২০২৬-এ প্রচলিত হারে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে এখন যেসব কর্মচারী বাড়িভাড়া ভাতার হার কিংবা উচ্চতর গ্রেডের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের জন্য বিষয়টি মূলত বাস্তবায়ন ও ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
২৪ সেপ্টেম্বরের আবেদনে উত্থাপিত দাবিগুলো এখন পর্যন্ত একটি আবেদন ও দাবি হিসেবে বিবেচ্য। এটি নিজে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা নতুন প্রজ্ঞাপন নয়। অর্থ বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা, পরিপত্র বা অফিস আদেশ জারি করলে তখনই দাবিগুলোর প্রশাসনিক কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সংক্ষেপে আবেদনের মূল দাবি
১. ৯ম পে-স্কেল ২০২৬-এ বাড়িভাড়া ভাতার অসামঞ্জস্য দূর করা।
২. জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫-এর নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া ভাতা বহাল রাখার বিষয় বিবেচনা করা।
৩. ৮ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড এবং ৯ম বছরে বেতন নির্ধারণের বিধান কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা স্পষ্ট করা।
৪. পূর্বে টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড/উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের নতুন উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে অবস্থান স্পষ্ট করা।
৫. একই পদে পদোন্নতি না পাওয়া এবং একাধিক উচ্চতর গ্রেডের বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্পষ্টীকরণ আদেশ জারি করা।
সারকথা: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আবেদনটি নবম পে-স্কেল নিয়ে নতুন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে না; বরং বাড়িভাড়া ভাতার কাঠামো এবং উচ্চতর গ্রেডের বিধান বাস্তবায়নে যেসব প্রশ্ন ও অসামঞ্জস্য কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর প্রশাসনিক স্পষ্টীকরণ চাওয়া হয়েছে। এখন অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় বা কোনো ব্যাখ্যামূলক আদেশ জারি করে কি না, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


